ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ আরও বেড়েছে।
মঙ্গলবার যেখানে দিনের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪৪ মেগাওয়াট, বুধবার তা বেড়ে চড়েছে ২ হাজার ৪৯৫ মেগাওয়াটে।
Manual5 Ad Code
বিদ্যুৎ বিভাগের দুই দিনের তথ্য অনুযাযী, জাতীয় পর্যায়ে চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক বেড়েছে। গড় লোডশেডিংও ২ দশমিক ৯ ঘণ্টা থেকে ৩ দশমিক ৭ ঘণ্টায় উঠেছে। আর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে পল্লী বিদ্যুৎনির্ভর এলাকায়।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গতকাল (বুধবার) থেকে একটু বেড়ে গেছে, আড়াই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি চলে গেছে।
Manual2 Ad Code
“আদানির পাওয়ার প্ল্যান্টের দুই নম্বর মেশিনটা বন্ধ হয়ে গেছে। যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য বন্ধ হয়েছে।”
তিনি বলেন, “ইউনিটটি পরশুদিন রাত ১টার দিকে বন্ধ হয়। সেটি মেরামত করে আবার চালু করতে ৩ থেকে ৪ দিন লাগতে পারে।”
২১ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল: কী বদলাল
২১ এপ্রিল মঙ্গলবার রাত ১২টায় দেশের প্রকৃত বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৮৫২ মেগাওয়াট।
সেদিন দুপুর ১২টায় চাহিদা নেমে আসে ১৪ হাজার ৭৯২ মেগাওয়াটে। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয় ১ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট।
বিকাল ৩টায় সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় লোডশেডিং বেড়ে ২ হাজার ৪৪ মেগাওয়াটে ওঠে। রাত ৯টার দিকে চাহিদা ওঠে ১৫ হাজার ৬৯৪ মেগাওয়াটে। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৮৫৪ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট।
কিন্তু ২২ এপ্রিল বুধবারের চিত্র আরও খারাপ। ওই দিন রাত ১২টায় চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট। সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৭৬৪ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১৬৮ মেগাওয়াট।
দুপুর ১২টায় চাহিদা দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৯১ মেগাওয়াটে। সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৫৯৮ মেগাওয়াট। লোডশেডিং বেড়ে হয় ২ হাজার ৪৯৩ মেগাওয়াট।
Manual7 Ad Code
বিকাল ৩টায় চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮৩৮ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৩৪৩ মেগাওয়াট। লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৯৫ মেগাওয়াট, যা দুই দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ।
রাত ৮টায় চাহিদা ওঠে ১৫ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াটে। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট।
তার মানে, মঙ্গলবারের তুলনায় বুধবার সর্বোচ্চ চাহিদার সব সময়েই ঘাটতি বেড়েছে। দুপুর ১২টায় লোডশেডিং ১ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট থেকে এক লাফে ২ হাজার ৪৯৩ মেগাওয়াটে উঠেছে। বিকাল ৩টায় ২ হাজার ৪৪ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৪৯৫ মেগাওয়াট। গড় লোডশেডিংও বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮ ঘণ্টা।
যা বলছে পিডিবি
পিডিবির সদস্য জহুরুল ইসলাম বলছেন, এই বাড়তি চাপের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আদানির ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়া।
তার ভাষায়, “আমাদের কাছে এই মুহূর্তে অন্য কোনো মেশিন নাই। জ্বালানিরও কিছু সমস্যা, কিছু ঘাটতি আছে, স্লোনেস আছে, যার জন্য লোড শেড হচ্ছে।”
তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশি খরচের ডিজেলচালিত কেন্দ্রও চালু রাখা হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা ধরে রাখতে খুলনায় ২২৭ মেগাওয়াট অতিরিক্ত উৎপাদন যোগ করা হয়েছে। হরিপুর ও সিদ্ধিরগঞ্জের ইউনিট চালানো হয়েছে। চাঁদপুরে রক্ষণাবেক্ষণে থাকা একটি ইউনিটেও ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। শাহজীবাজারে একটি ইউনিটের কাজ পিছিয়ে শুক্রবারে নেওয়া হয়েছে, যাতে অন্তত পরীক্ষার সময় সরবরাহে চাপ কিছুটা কমানো যায়।
জহুরুল বলেন, “লোড শেডটা কভার করার জন্য ডিজেল বেস পাওয়ার প্ল্যান্ট অনেকগুলো চালিয়ে পিক টাইমগুলো অনেকটাই কভার করার চেষ্টা করছি। তার পরও কিছুটা প্রবলেম হচ্ছে, এটা তো আমরা অস্বীকার করি না।”
শহরে কম, গ্রামে বেশি
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বড় শহরভিত্তিক বিতরণ কোম্পানিগুলোর লোডশেডিং ছিল তুলনামূলক কম; বিপরীতে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার ঘাটতি ছিল অনেক বেশি।
মঙ্গলবার ডেসকো এলাকায় চার সময়েই চাহিদা অনুযায়ী পূর্ণ সরবরাহ ছিল। ডিপিডিসিতে ঘাটতি ছিল খুবই সামান্য। ওই দিন ঢাকার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় গড় লোডশেডিং ছিল ৪ দশমিক ৫ ঘণ্টা। আর বিকাল ৩টায় শুধু এই এলাকাতেই লোডশেডিং ছিল ৬২০ মেগাওয়াট।
বুধবারও ডেসকো এলাকায় চার সময়েই পূর্ণ সরবরাহ ছিল। ডিপিডিসিতে দুপুর ১২টায় ৬ মেগাওয়াট এবং বিকাল ৩টায় ১২ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা গেলেও রাত ৮টায় ঘাটতি ছিল শূন্য।
কিন্তু ঢাকার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় রাত ১২টায় লোড শেডিং ছিল ৫৩১ মেগাওয়াট, দুপুর ১২টায় ৬০১ মেগাওয়াট, বিকাল ৩টায় ৫৪৬ মেগাওয়াট এবং রাত ৮টায় ৪৩৯ মেগাওয়াট। এ এলাকায় গড় লোডশেডিং হয়েছে ৪ দশমিক ৮ ঘণ্টা।
কেবল ঢাকায় নয়, প্রায় সব জোনেই পল্লী বিদ্যুতে লোডশেডিং বেশি দেখা গেছে।
বেশি চাপে ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর, কুমিল্লা
Manual8 Ad Code
মঙ্গলবার সব জোনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গড় লোডশেডিং ছিল ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায়, ৭ দশমিক ১ ঘণ্টা। পরদিন তা আরও বেড়ে ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা হয়েছে।
বুধবার এ এলাকায় রাত ১২টায় ১ হাজার ১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬৯৫ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ৩১৫ মেগাওয়াট। দুপুর ১২টায় ঘাটতি ছিল ৩৪৯ মেগাওয়াট, বিকাল ৩টায় ৩১৭ মেগাওয়াট, রাত ৮টায় ২৮৯ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।
সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় মঙ্গলবার গড় লোডশেডিং ছিল ৫ দশমিক ৪ ঘণ্টা। পরদিন এই সময় ছিল ৫ দশমিক ৩ ঘণ্টা। কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ৪ দশমিক ১ ঘণ্টা থেকে ৫ দশমিক ১ ঘণ্টায় উঠেছে।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ৩ দশমিক ৬ ঘণ্টা থেকে ৫ দশমিক ২ ঘণ্টা হয়েছে। রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ৪ ঘণ্টা থেকে ৫ দশমিক ৫ ঘণ্টায় উঠেছে। খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ৩ দশমিক ২ ঘণ্টা থেকে ৫ দশমিক ৪ ঘণ্টায় পৌঁছেছে।
অন্যদিকে একই জোনের শহর এলাকায় তুলনামূলক চাপ কম ছিল। রাজশাহীতে নেসকো এলাকায় মঙ্গলবার গড় লোডশেডিং ছিল ০ দশমিক ৬ ঘণ্টা, ২২ এপ্রিল হয়েছে ২ দশমিক ১ ঘণ্টা।
সিলেট পিডিবি এলাকায় ২২ এপ্রিল গড় লোডশেডিং ছিল শূন্য দশমিক ৯ ঘণ্টা। কুমিল্লা পিডিবিতে ১ দশমিক ২ ঘণ্টা, বরিশালের ওয়েস্ট জোনে ৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা, খুলনার ওয়েস্ট জোনে ৩ দশমিক ৫ ঘণ্টা।
সামনে স্বস্তি মিলবে?
কতদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে জহুরুল ইসলাম বলেন, “আমার ধারণা আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি নাগাদ এগুলো নরমাল হতে পারে।”
তিনি বলেন, এটি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর প্রতিশ্রুত সময়সূচির উপর। আদানি কর্তৃপক্ষ বলছে, তিন থেকে চার দিনের মধ্যে তাদের ইউনিট চালু হবে। আর এসএস পাওয়ার জানিয়েছে, আগামী শনি বা রোববারের মধ্যে তাদের একটি ইউনিট উৎপাদনে আসতে পারে।
এই দুই ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১৩০০ মেগাওয়াট যোগ হবে বলে জানান পিডিবির সদস্য জহুরুল।
তিনি বলেন, “এই দুইটা মেশিন আসলে ১৩০০ মেগাওয়াট চলে আসে। ১৩০০ মেগাওয়াট চললে লোডশেডিংটা অর্ধেকে নেমে আসে। এখন যে অসুবিধা হচ্ছে, সেটা অনেকটাই কমে আসবে।”
পিডিবির এই সদস্য এও বলেন, নতুন কোনো সমস্যা না হলে তবেই এই উন্নতি আশা করা যাচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি ঘাটতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “স্বাভাবিক হবে, তার পরেও হয়তো ১২০০ মেগাওয়াট লোড শেড তো ওই হিসাবেই থাকে।
“তবে এখন যে প্রবলেমটা আছে, সেটা অর্ধেকের মতো নেমে আসবে।”