আজ সোমবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সব পদেই কাজ করার মানসিকতা থাকা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী

editor
প্রকাশিত মে ৩, ২০২৬, ০৫:৩৩ অপরাহ্ণ
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সব পদেই কাজ করার মানসিকতা থাকা জরুরি: প্রধানমন্ত্রী

Manual2 Ad Code

বাসস

জনপ্রশাসনের প্রতিটি পদই সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কর্মকর্তাদের সব পদেই কাজ করার মানসিকতা থাকা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র পদোন্নতি কিংবা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিং এর জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করলে সাময়িকভাবে হয়তো লাভবান হবেন, তবে সেটি সার্বিকভাবে জনপ্রশাসনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সবসময় নিজেদের পছন্দের পদে পদায়ন কিংবা পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতাই দুর্নীতি পরায়ণতা ও অপেশাদারীত্বের অন্যতম কারণ।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাই আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান, জনপ্রশাসনের প্রতিটি পদকে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য ভাবুন। দেশের যে কোনো স্থানে, যে কোনো সময় জনপ্রশাসনের যে কোনো পদে দায়িত্ব পালনে নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন।’

Manual6 Ad Code

আজ রোববার (৩রা মে) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। চার দিনব্যাপী এ সম্মেলন শেষ হবে ৬ মে।

এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘সততা, মেধা এবং দক্ষতাই হবে জনপ্রশাসনের নিয়োগ, বদলি কিংবা প্রমোশনের মূলনীতি। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সঙ্গে শূন্য পদে জনবল নিয়োগ, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন, বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নসহ সর্বত্র প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’

সম্মেলন উদ্বোধনকালে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টামণ্ডলী, মন্ত্রী পরিষদ সচিব, স্বশস্ত্রবাহিনীর প্রধানগণ, অন্যান্য উধ্বতন কর্মকর্তা, বিভাগীয় কমিশনারগণ এবং জেলা প্রশাসকগণ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ১০ টা ২০ মিনিটের দিকে বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিজ দফতর থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আসেন।

এ সময় রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ কথা জানান।

ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী শাসন ব্যবস্থার প্রত্যাশায় থাকা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে বর্তমান সরকার। স্বাভাবিকভাবেই জনগণ সরকারের প্রতিটি কাজের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্ক্ষার একটি বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাইবে।

Manual3 Ad Code

তিনি বলেন, আর বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকগণই জনগণের সঙ্গে সরকারের প্রধান সেতু বন্ধন। আপনাদের সততা, কর্মদক্ষতা ও দায়বদ্ধতার ওপর সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের সাফল্য পুরোটাই নির্ভর করছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিগত জাতীয় নির্বাচনে জনপ্রশাসনের যারা পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘জনপ্রশাসন সঠিকভাবে কাজ করলে অবশ্যই জনগণের রায় যে প্রতিফলিত হয় সেটি আপনারা প্রমাণ করেছেন গত ১২ তারিখের নির্বাচনে। অপরদিকে যদি আপনাদের কাজ করতে না দেওয়া হয় তাহলে কি হতে পারে সেটিও আমরা ১৪, ১৮ বা ২০২৪ সালে দেখেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গতকাল বিকেলে আপনারা দেখেছেন বাচ্চাদের স্পোর্টসের একটি অনুষ্ঠান। আপনারা দেখেছেন, বাচ্চাগুলোর কি স্পৃহা মনের মধ্যে, তারা এগিয়ে যেতে চায়। আমার মনে হয় আজকের এই জেলা প্রশাসক সম্মেলনের মেইন স্পৃহা বা মোটো হোক সেই বাচ্চাদের মোটোটা । অর্থাৎ সামনে এগিয়ে যাওয়া। এটাই হোক আজকে আমাদের অনুষ্ঠানের স্পিরিট।’

এ সময় আরও বক্তব্য দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার প্রমুখ।

উল্লেখ্য, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শুরু হয়েছে।

সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল বিভাজিত জনপ্রশাসন এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে। আপনাদের সহযোগিতায় সেই পরিস্থিতির অনেকখানি আমরা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছি এই আড়াই মাসে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতি ও লুটপাটের মহারাজত্ব কায়েম হয়েছিল। রাষ্ট্র ও জনগণকে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে ভয়ানক ঋণের ফাঁদে। অপরদিকে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিও নতুন সরকারের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে হয়তো এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোন দেশই রক্ষা পায়নি। বাংলাদেশও এফেক্টেড হয়েছে। তবে জনগণের ভোগান্তি না বাড়িয়ে আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করছি কিভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়। আপনাদের সহযোগিতায় সেই চেষ্টা আমরা অব্যাহত রেখেছি। ঠিক এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই কিন্তু বর্তমান সরকার দেশের আবহমান কালের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের আলোকে একটি ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার দেশের প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষের জীবন মান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।

তারেক রহমান বলেন, ‘ইতোমধ্যে একটি নীতিমালার ভিত্তিতে জনপ্রশাসন অর্থাৎ আপনাদের মাধ্যমেই কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, স্পোর্টসের বিষয়টিসহ দেশে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদেরকেও প্রতিমাসে আমরা সম্মানীর ব্যবস্থা করেছি। আপনাদের মাধ্যমে এ কার্যক্রমগুলো শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ম্যানিফেস্টো এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা, প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। আমরা এ ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। আমি আশা করব, আপনারা মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন। ’

Manual6 Ad Code

একইসঙ্গে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত আইন কানুন ও জটিলতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তবসম্মত, কার্যকর ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা আমরা প্রশাসনের সকল পর্যায়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। যাতে জনগণ সরকারের প্রতিটি কর্মসূচির প্রত্যাশিত সুফল সময়মতো লাভ করতে পারে।

বিশ্ব এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে প্রবেশ করেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে আমরা সবাই ওয়াকিবহাল। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অবশ্যই জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও সময় মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত রাখতে হবে।

চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে মোট অধিবেশন হচ্ছে ৩৪টি। এর মধ্যে কার্য অধিবেশন ৩০টি এবং অংশগ্রহণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংখ্যা হচ্ছে ৫৬টি। সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ৪৯৮টি প্রস্তাব উত্থাপিত হচ্ছে। ৫৬টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীগণ সম্মেলনে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সম্মেলন কেবল আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়ের জায়গা হওয়া উচিত নয়। বরং এটি এমন একটি পরিসর যেখানে মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজন এবং উদ্ভাবনী চিন্তা সরাসরি জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হতে পারে বা হওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে। আপনারা মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রশাসনিক অ্যাম্বাসেডর। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গ্রামীণ জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ জনগণের শহরমুখিতা হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নিয়ামক হিসেবে দেখা প্রয়োজন। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কার্যকর, নিয়মিত এবং দৃশ্যমান করা প্রয়োজন।

Manual5 Ad Code

একইসঙ্গে সরকারি কার্যালয়ে গিয়ে সেবা প্রার্থীরা যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার না হয় কিংবা বিলম্ব বা অনিয়মের শিকার না হয় সে ব্যাপারে ডিসিদের কঠোর নজর রাখতে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘জনগণের যে কোন ন্যায্য অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে প্রতিকারের ব্যবস্থা আপনারা করবেন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, বাল্যবিবাহ রোধসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যেগুলো আপনাদের সক্ষমতার মধ্যেই আছে। বিশেষ করে আবারো আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন-দয়া করে এই কয়টি বিষয়ে আপনারা আপনাদের অবস্থান থেকে পদক্ষেপ নেবেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের মধ্যে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু দেশের স্বার্থে ব্যক্তিগতভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি ‘সবার আগে বাংলাদেশ।’