আজ শুক্রবার, ৯ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাম: ছেলেকে দাফনের পর মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে লড়ছেন দম্পতি

editor
প্রকাশিত মে ২৫, ২০২৬, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ
হাম: ছেলেকে দাফনের পর মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে লড়ছেন দম্পতি

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

  • রোববার পর্যন্ত সিলেট বিভাগের চার জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা আতাউর রহমানের স্ত্রীর কোল জুড়ে এসেছিল যমজ ছেলেমেয়ে। একসঙ্গে দুই সন্তানের জন্ম সংসারে আনন্দের জোয়ার এনেছিল। তবে এ অনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

Manual6 Ad Code

কারণ হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ছেলের। আর মেয়েকে নিয়ে আইসিইউতে আছেন আতাউর। পাশে থাকছেন তার স্ত্রী লাকী বেগম। ছয় মাস ১৬ দিন বয়সী ছেলে আদিলকে হারিয়ে এই দম্পতি শোকগ্রস্ত। কিন্তু এখন সব ভুলে মেয়ে নুসাইফা বাঁচাতে লড়ছেন তারা।

পেশায় রাজমিস্ত্রি আতাউর বাচ্চাদের চিকিৎসার জন্য বাড়িতে থাকা ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। করেছেন আত্মীয়দের কাছ থেকে ধারদেনা। তাতেও কুলাচ্ছে না। এখন সুদে টাকা এনে মেয়ের চিকিৎসা করাচ্ছেন।

রোববার (২৪ মে) পর্যন্ত সিলেট বিভাগের চার জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।

দুপুরের দিকে হাম ডেডিকেটেড সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডের সামনে আতাউর রহমানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি তখন আইসিইউ ওয়ার্ডের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাচের জানালা দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করছিলেন।


তাকে ডেকে কে অসুস্থ জানতে চাইলে টলমল চোখে বলেন, “মেয়ে ভর্তি আছে। ছেলেটা মারা গেছে। এখন মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। মেয়েটার অবস্থা আগের মতই।”

আতাউর বলেন, তার যমজ ছেলেমেয়ের একসঙ্গে জ্বর এসেছিল। তারপর সুনামগঞ্জ হাসপাতালে ১৪ দিন চিকিৎসা করিয়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তারপর তিন দিন ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসার পর ছেলের আইসিইউ দরকার পড়ে। তখন সিলেট নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের ভর্তি করান। ভর্তি থাকা অবস্থায় জ্বর, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া নিয়ে ছেলেটি ১৫ মে মারা যায়। ডাক্তার বলেছেন, সে হামে আক্রান্ত হয়েছিল।

তিনি বলেন, “ছেলেকে দাফনের পর দিন ১৬ মে মেয়ের জ্বর থাকায় তাকে সিলেট উইমেন্স মেডিকেলে ডাক্তার দেখাই। উইমেন্স মেডিকেলে পাঁচ দিন ভর্তি থাকার পর বৃহস্পতিবার বিকালে শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে নিয়ে আসি। রাত ১টার দিকে মেয়েটাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। আমার মেয়ের শরীরে জ্বর-র‌্যাশ, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া রয়েছে। এটা হাম রোগ ভাই। আজ তিন দিন হয়ে গেছে মেয়েটার তেমন উন্নতি নেই, ভেতরে ভয় কাজ করছে। কারণ, যমজ বাচ্চার জ্বর হলে দুটির এক সঙ্গে জ্বর আসেরে ভাই। আমার মেয়েটার জন্য দোয়া করবেন ভাই।”

এ সময় আতাউর বলেন, ছেলেমেয়ে দুটিকে ছয় মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ দিয়েছিলেন। জ্বর আসায় আর টিকা নেওয়া হয়নি। এরপর থেকেই হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন।

পাশে দাঁড়ানো শিশুটির মা লাকী বেগম (২৯) বলেন, “এক মাস ধরে বাচ্চাদের পিছনে দৌড়াচ্ছি। ছেলেটা মারা গেছে, এখন মেয়েটার অবস্থা বেশি ভালো না। ছেলেটাকে দাফনের পর দিন সকাল থেকে মেয়েটা নিয়ে ডাক্তারের কাছে আছি। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে, আরও হচ্ছে। ছেলেমেয়ে চিকিৎসার জন্য সুদে টাকা এনে খরচ করতেছি।”

তিনি বলেন, “আজ সকালে ডাক্তার মেয়েটার অবস্থা একটু ভালো হওয়াতে অক্সিজেন মাস্ক খুলেছিলেন। তারপর আবার মেয়েটার অবস্থা খরাপ হলে অক্সিজেন মাস্ক দিয়েছে রে ভাই। ডাক্তার বলেছেন, মেয়ের জন্য দোয়া করার জন্য, অবস্থা বেশি ভালো না। আমরা দুজন শুধু বেঁচে আছি আরকি। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”

একই ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ফিরোজ আলী বলেন, তার ছেলের দিকের চার মাস বয়সি নাতিন অয়িহাকে নিয়ে সাত দিন ধরে আইসিইউতে আছেন। অবস্থা তেমন ভালো না।

Manual7 Ad Code

তিনি বলেন, “রোববার ভোর ৫টার দিকে অক্সিজেন লেভেল কমে যায়, তারপর ডিউটিতে থাকা ডাক্তার বলেন, দোয়া করেন, ছেলের অবস্থা বেশি ভালো না। পরে ডাক্তার ইনজেকশন দেন। এর ঘণ্টাখানিক পর তার অবস্থা ঠিক হয়। আমার ছেলের প্রথম বাচ্চা, তাকে নিয়ে আমরা খুব টেনশনে আছি। এখন অক্সিজেন লেভেল ভালো আছে, বাকিটা আল্লাহার ইচ্ছা।”

সিলেট শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, “হাসপাতালে মারা যাওয়া বেশিরভাগ রোগী সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই, ছাতক ও জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা। এ ছাড়া সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও সদর উপজেলার রোগীরা রয়েছে। এই এলাকাগুলো থেকে রোগী আসতেছে। হাম নিয়ন্ত্রণে টিকা কর্মসূচির উপর জোর দিতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। বাচ্চাদের টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।”


হাম উপসর্গ নিয়ে আরেক শিশুর মৃত্যু

সিলেট বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট মাস বয়সী শিশুর মৃত্যু হয় বলে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানিয়েছেন।

এ নিয়ে সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে। মারা যাওয়া শিশুটি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা জুয়েল হকের মেয়ে লাবিবা।

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭৩ জন। বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন প্রায় ২৯৯ রোগী।

Manual7 Ad Code

এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৭৯ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

Manual2 Ad Code

সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৫০ রোগী চিকিৎসাধীন। বাকিরা বিভাগের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতালে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ল্যাব পরীক্ষায় ১৫৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ বছরে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে চারজনের হাম শনাক্ত হয়েছে। বাকি ৪৮ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়।

তাদের অধিকাংশই হৃদরোগ, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিল। যার কারণ হিসেবে শিশুদের পুষ্টিহীনতার অভাবকে দায়ী করছেন চিকিৎসকরা।

তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর