আজ রবিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গা সংকটের দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে নিতে হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

editor
প্রকাশিত আগস্ট ২৩, ২০২৬, ০৭:৫৯ অপরাহ্ণ
রোহিঙ্গা সংকটের দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে নিতে হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

Manual3 Ad Code

বাসস

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করাটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের একার পক্ষে এই সংকটের বোঝা বহন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে, তবে বাংলাদেশকে যেন একা দাঁড়াতে না হয়।’

রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীতে ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) এবং অক্সফাম ইন বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘রোহিঙ্গা সংকটের ১০ বছর: মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধানের পথে’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শামা বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় ১০ বছর পূর্তি শুধু ফিরে দেখার সময় নয়, বরং নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময়। টেকসই সমাধান ছাড়া আরেকটি দশক পার হতে দেওয়া যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘একটি সরকারের জন্য ১০ বছর একটি নীতিচক্র, একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি পরিকল্পনার সময়সীমা। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর জন্য ১০ বছর মানে পুরো শৈশব। একজন তরুণের জন্য এটি হারিয়ে যাওয়া শিক্ষা। একটি পরিবারের জন্য এটি একটি দশক ঘরহীন জীবন এবং একটি পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি প্রজন্ম বেড়ে ওঠা।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ১০ বছরকে ২০ বছরে পরিণত হতে দিতে পারি না।’

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের পর থেকে বাংলাদেশ তার সীমান্ত ও হৃদয় উন্মুক্ত রেখেছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিজস্ব উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ, সীমিত ভূমি ও উচ্চ জনঘনত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে।

তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবেশ, জনসেবা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তারপরও মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।

Manual4 Ad Code

তবে বাংলাদেশের এই মানবিক উদারতা আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না উল্লেখ করে শামা বলেন, ‘বাংলাদেশ আশ্রয় দিতে পারে, মানবিক সহায়তা দিতে পারে এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষায় সহায়তা করতে পারে। কিন্তু যে সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি, সেই সংকটের সমাধান বাংলাদেশ একা করতে পারে না।’

২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের আওতায় অর্থায়ন কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থায়ন কমলেও মানবিক সহায়তার প্রয়োজন অপরিসীম। খাদ্য, পুষ্টি, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি, শিক্ষা এবং সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো রোহিঙ্গাদের জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান।

বড় ধরনের অর্থায়ন ঘাটতি হলে এর প্রভাব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, ক্যাম্পের স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উদ্দেশে শামা বলেন, ‘মানবিক সহায়তায় ক্লান্তি যেন মানবিক পরিত্যাগে পরিণত না হয়।’

তিনি রোহিঙ্গা সংকটের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের ওপর সৃষ্ট চাপের কথাও তুলে ধরেন। তাদের জীবিকা, পরিবেশ ও জনসেবা দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তাকে ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

Manual3 Ad Code

ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অবদানের প্রশংসা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। এর টেকসই সমাধানও শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে।’

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য উল্লেখ করে শামা বলেন, ‘এটি শুধু একটি রাজনৈতিক পছন্দ নয়; এটিই একমাত্র টেকসই পথ।’

Manual8 Ad Code

রোহিঙ্গারা নিজেরাও বারবার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি শরণার্থী শিবির কখনোই একটি নিজস্ব মাতৃভূমির স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না।’

দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনের যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়টিও যাচাই প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন।

শামা বলেন, সঠিক তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য যাচাই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় চ্যানেল, জাতিসংঘ, আঞ্চলিক ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে গঠনমূলক যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজতর করতে সব ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চীনের ভূমিকার প্রসঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দেশটির নেতৃত্বের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, দায়িত্ব ভাগাভাগি শুধু সহানুভূতি প্রকাশ বা সংহতির বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর অর্থ হতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ, পূর্বানুমেয় অর্থায়ন, ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, জবাবদিহি এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী সমাধান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রায় এক দশক আগে একটি মানবিক জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাংলাদেশের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারও সফলভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে শামা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট যেন আন্তর্জাতিক এজেন্ডা থেকে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আপনারা শুধু সংকটের সংবাদ পরিবেশন করছেন না, বিশ্ব কীভাবে এই সংকটকে দেখবে, তা গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখছেন।’ দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য-প্রমাণ ও বাস্তব তথ্যের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ত্রাণনির্ভরতা থেকে সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংহতি থেকে দায়িত্ব ভাগাভাগি, মানবিক ব্যবস্থাপনা থেকে রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি থেকে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান শামা।

Manual1 Ad Code

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শুধু বেঁচে থাকার চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ার অধিকার রাখে। তাদের একটি ভবিষ্যৎ, একটি ঘর, নিরাপত্তা ও মর্যাদা এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।’