সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স ও মানতের ডেগের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করা হয়নি। গত ১৫ আগস্ট তৃতীয় দফায় টাকা গণনার পর সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, দানকৃত অর্থ পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা চূড়ান্ত হয়েছে এবং তা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। তবে এরপর এক মাস পেরিয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) চতুর্থ দফায় দানবাক্স খোলা হলেও সেই নীতিমালার বিস্তারিত সামনে আসেনি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—নীতিমালা চূড়ান্ত হয়ে থাকলে তা কেন কার্যকর করা হচ্ছে না? নীতিমালার অনুপস্থিতিতে বর্তমানে কোন নিয়মে বা কার নির্দেশে এই বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করা হচ্ছে?
প্রথম দফা (২২ জুন) সংগৃহীত হয় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে আরও ৫ লাখ টাকা যুক্ত করে মোট ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা ব্যাংকে রাখা হয়।
দ্বিতীয় দফা (১১ জুলাই) সংগৃহীত হয় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা।
তৃতীয় দফা (১৫ আগস্ট) সংগৃহীত হয় ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা।
চতুর্থ দফা (১৯ সেপ্টেম্বর) সংগৃহীত হয় সর্বোচ্চ ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা।
নগদ টাকা ছাড়াও ১ ভরি ৯ আনা ২ রতি সোনা, রূপা এবং পাউন্ড, ডলার, রিয়ালসহ অন্তত ১৫টি দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া গেছে।
মাজারের খাদেমদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এতদিন বংশানুক্রমে দায়িত্ব পাওয়া পরিবারগুলো পর্যায়ক্রমে মাজার দেখভাল করত, যাকে ‘বাড়ি প্রথা’ বলা হয়। ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত আয় থেকেই মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ, লঙ্গরখানা ও কর্মচারীদের বেতন পরিচালিত হতো।
চলতি বছরের জুনে স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা উঠলে ১৮ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে পুরোনো দানবাক্স ও ৩টি ডেগ সিলগালা করে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়। এরপর ডিসির বদলি এবং বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার মুখে ২৬ জুন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, সংগৃহীত টাকা সোনালী ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট হিসাবে জেলা প্রশাসনের তদারকিতে জমা থাকবে।
নীতিমালা বাস্তবায়নে দেরি হলেও বর্তমান প্রশাসনিক তদারকিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন মাজারের স্বচ্ছতা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কমিটির সদস্য এবং সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী।
কয়েস লোদী বলেন, “মাজারে কত টাকা জমা হচ্ছে এবং তা কোথায় রাখা হচ্ছে—আগে এ বিষয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা ছিল না। এখন মানুষ বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানতে পারছেন। এই অর্থ কীভাবে ব্যবহার ও বণ্টন করা হবে, তা ঠিক করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা কাজ করছে। শিগগিরই বৈঠকের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে দরগাহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম সভাতেই অর্থমূল্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছিলেন। এখানে কোনো দ্বিমত নেই, সবাই একসাথে কাজ করছেন। তাই এই বিষয় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি, বিভ্রান্তি বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।”
এদিকে, চূড়ান্ত নীতিমালার বর্তমান অবস্থা ও সংগৃহীত অর্থ খরচের বিদ্যমান নিয়ম সম্পর্কে জানতে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।