আজ সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে প্রথম মরণোত্তর দেহদান লিটন দাশের 

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ণ
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে প্রথম মরণোত্তর দেহদান লিটন দাশের 

Manual6 Ad Code

মোঃ একে কাওসার, জেলা প্রতিনিধি (হবিগঞ্জ) :

মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু কিছু মৃত্যু সমাজকে এক অনন্য বার্তা দিয়ে যায়। তেমনই এক মানবিক ও সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিদায় নিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কৃতি সন্তান ও সমাজসেবক লিটন দাশ (৩৫)। মৃত্যুর পর নিজের নশ্বর দেহটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য উৎসর্গ করে সর্বস্তরের মানুষের বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রশংসায় ভাসছেন এই যুবক। শিক্ষা ও গবেষণার কাজে কোনো মৃত ব্যক্তির দেহদানের ঘটনা হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ইতিহাসে এটিই প্রথম।
নিহত লিটন দাশ সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের হরিনাকান্দি গ্রামের দ্বিজেন্দ্র দাশের ছেলে। দীর্ঘ দিন ধরে জটিল কিডনি রোগে ভুগছিলেন তিনি। হঠাৎ করে দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যাওয়ার পর নিজের মৃত্যুর বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিলেন লিটন। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় নবীগঞ্জ শহরতলির শিবপাশা গ্রামে বড় ভাইয়ের বাসায় গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসকদের মাধ্যমে নিজের শারীরিক অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পর গত ১৩ আগস্ট লিটন দাশ নিজে উদ্যোগী হয়ে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করেন। এরপর হবিগঞ্জের নোটারি কার্যালয়ে মরণোত্তর দেহদানের ঘোষণাপত্র সম্পাদন করেন। এই মহতী ও সমাজকল্যাণমূলক সিদ্ধান্তে পূর্ণ সম্মতি জানিয়ে তাঁর বড় ভাই দিপু দাশ তালুকদার ও মা রেখা রাণী দাশ ঘোষণাপত্রে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন।
গত রোববার লিটন দাশের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. জাবেদ জিল্লুল বারি ও এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মরদেহ হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। জেলা প্রশাসনের অনুমতিসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে ওই দিন রাত সাড়ে আটটার দিকে লিটনের মরদেহ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন তাঁর স্বজনেরা।
এ সময় মেডিকেল কলেজের এনাটমি বিভাগের প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য, প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায় ও ক্যাশিয়ার নারায়ণ পাল মরদেহটি বুঝে নেন। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে লিটনের বড় ভাই দিপু দাশ, বাসদ হবিগঞ্জ জেলার সদস্যসচিব শফিকুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট সবুজ দাশ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন।
লিটন দাশ কেবল শেষ জীবনেই নয়, ছাত্রজীবন থেকেই সামাজিক ও মানবিক বিভিন্ন প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষাজীবনে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যাচেলর অব এগ্রিকালচার এডুকেশন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে কিছুদিন গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরি করলেও পরে তা ছেড়ে নিজ গ্রামে ফিরে এসে একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন ধরনের সবজি, মাছ ও বাদাম চাষে অনন্য সফলতা পেয়ে এলাকায় বেশ সুপরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
লিটনের এই অকালপ্রয়াণ ও মহৎ কীর্তিতে পুরো এলাকায় গভীর শোকের পাশাপাশি এক গর্বের আবহ তৈরি হয়েছে। হরিনাকান্দি গ্রামের প্রবীণ সমাজকর্মী রাখাল দাশ জানান, “লিটন শিক্ষিত ও অত্যন্ত নম্রভদ্র যুবক হিসেবে পরিচিত ছিল। তার অকাল মৃত্যুতে আমরা শোকাভিভূত। তবে মৃত্যুর পর মরণোত্তর দেহদান করে সে আমাদের মাঝে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।” একই সাথে মেঘারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা তরুণ সমাজকর্মী মনজয় তালুকদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিটনের ছবি পোস্ট করে গভীর শোক প্রকাশ করেন।সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ঊর্ধ্বে উঠে লিটন দাশের এই মহান আত্মত্যাগ বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের শিক্ষা ও গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সুধীসমাজ।