আজ সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরো ইউরোপকে ৭২ ঘণ্টার খাবার-পানি-ওষুধ মজুতের নির্দেশ! কী ঘটছে

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৩:৪৮ অপরাহ্ণ
পুরো ইউরোপকে ৭২ ঘণ্টার খাবার-পানি-ওষুধ মজুতের নির্দেশ! কী ঘটছে

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

ইউরোপের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য খাবার, পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধসহ জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি সব নাগরিককে তিন দিনের খাবার, পানি ও ওষুধ মজুতের বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিয়েছে। বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রস্তুতি পরিকল্পনায় ৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভর থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইউরোপীয় কমিশন ২০২৫ সালের মার্চে ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ নামে একটি সমন্বিত প্রস্তুতি কৌশল গ্রহণ করে। এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে নাগরিকরা যেন অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন নিজেরাই মেটাতে পারেন। এ জন্য সদস্য দেশগুলোকে নাগরিক পর্যায়ে জরুরি প্রস্তুতি ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে ২১ সেপ্টেম্বর ইউরোপজুড়ে নতুন কোনো বাধ্যতামূলক আইন করে নাগরিকদের খাবার, পানি ও ওষুধ মজুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমন তথ্য নেই। এটি মূলত জরুরি পরিস্থিতির জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত রাখার একটি নীতি ও পরামর্শ।

Manual3 Ad Code

ইউরোপীয় প্রস্তুতি পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে বাস্তব কিছু আশঙ্কা। বড় ধরনের দুর্যোগ বা সংকটের পর বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। একই সময়ে জরুরি সেবা ও উদ্ধারকারী দলকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। ফলে সংকটের প্রথম কয়েক দিন নাগরিকদের নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো প্রস্তুতি থাকা জরুরি বলে মনে করছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ।

এই প্রস্তুতি শুধু যুদ্ধের জন্য নয়। বন্যা, দাবানল, চরম আবহাওয়া, মহামারি, সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বিদ্যুৎ বা পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সামরিক সংঘাতসহ বিভিন্ন ধরনের জরুরি পরিস্থিতিকে এর আওতায় রাখা হয়েছে।

ফ্রান্সে কী বলা হয়েছে

ফ্রান্সে ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতির বিষয়টি সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করা হচ্ছে। নাগরিকদের একটি জরুরি সামগ্রীর বাক্স বা ব্যাগ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে ফরাসি সরকার।

এতে পানীয় পানি, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবার, নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, টর্চ, ব্যাটারি, ব্যাটারিচালিত রেডিও, মোবাইল ফোনের চার্জার, নগদ অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি, অতিরিক্ত চাবি এবং প্রয়োজনীয় পোশাক রাখার পরামর্শ রয়েছে।
ফরাসি সরকারি নির্দেশনায় প্রতি ব্যক্তির জন্য প্রায় ৬ লিটার পানীয় পানি রাখার কথাও বলা হয়েছে। বড় ধরনের দুর্যোগের সময় পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

ফ্রান্সের সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালেও হালনাগাদ করা হয়েছে। ফলে দেশটিতে ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতি কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা নয়, বরং সরকারি নাগরিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ।
ইউরোপে এখন কেন বিষয়টি বেশি আলোচনায়

৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতির ধারণাটি নতুন নয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন, সাইবার হামলার আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা, নাশকতার ঝুঁকি এবং ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নাগরিক প্রস্তুতির বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
চলতি সেপ্টেম্বরেই ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন ইউরোপের নিরাপত্তা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ইউরোপীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা সমন্বয় বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
তবে এই সাম্প্রতিক নিরাপত্তা উদ্যোগকে ৭২ ঘণ্টার জরুরি সামগ্রী প্রস্তুতের নীতির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতির নীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২৫ সালের প্রস্তুতি কৌশলের অংশ এবং এর আওতা যুদ্ধের বাইরেও বিস্তৃত।

Manual1 Ad Code

ইউরোপের অন্যান্য দেশেও নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বেলজিয়াম নাগরিকদের সংকটের সময় অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম করার লক্ষ্যে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়েছে। নেদারল্যান্ডসেও জরুরি পরিস্থিতিতে বৈদ্যুতিন লেনদেনব্যবস্থা ব্যাহত হলে কিছু নগদ অর্থ হাতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে ইউরোপজুড়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বড় কোনো সংকটের শুরুতে সরকারি জরুরি সেবা সব মানুষের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাতে নাও পারে। তাই পরিবার পর্যায়ে আগে থেকেই কিছু প্রস্তুতি রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তাহলে কি ইউরোপ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতিকে কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব নীতিতেই বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ ও সংকটের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন যে এই প্রস্তুতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে, সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার হামলা, নাশকতা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো আগের তুলনায় বেশি সতর্ক।

সব মিলিয়ে ইউরোপে এখন যে বার্তাটি জোরালো হচ্ছে তা হলো আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি। নাগরিকদের তিন দিনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো সামগ্রী হাতে রাখার পরামর্শ তারই অংশ।

Manual2 Ad Code

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘ইউরোপজুড়ে নতুন করে ৭২ ঘণ্টার খাবার, পানি ও ওষুধ মজুতের বাধ্যতামূলক নির্দেশ’ কথাটি বিভ্রান্তিকর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নীতি ২০২৫ সাল থেকেই কার্যকর প্রস্তুতি কাঠামোর অংশ। ২০২৬ সালেও বিভিন্ন দেশে এর বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজ চলছে।

ফ্রান্সেও নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার সরকারি পরামর্শ বহাল রয়েছে। এর উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া নয়; বরং বড় ধরনের দুর্যোগ, জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়া কিংবা নিরাপত্তা সংকটের প্রথম কয়েক দিনে নাগরিকদের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

 

Manual3 Ad Code