আজ শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপের বাইরেও তরুণদের বিক্ষোভ ছড়াচ্ছে, নতুন করে যোগ হচ্ছে জার্মানি

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ০৪:৫১ অপরাহ্ণ
ইউরোপের বাইরেও তরুণদের বিক্ষোভ ছড়াচ্ছে, নতুন করে যোগ হচ্ছে জার্মানি

Manual1 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদ, কোথাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, আবার কোথাও শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার ফ্রান্স, সার্বিয়া, তিউনিসিয়া, কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলায় বিক্ষোভের খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এ ছাড়া আগামী ৩১ অক্টোবর জার্মানির ২১টি শহরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তরুণদের একটি সংগঠন।

দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ ও ধরন আলাদা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও আটকের ঘটনায় গড়িয়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছে। সার্বিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সামনে এখন আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন। ভেনেজুয়েলায় অবাধ নির্বাচনের দাবি উঠেছে। তিউনিসিয়ায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে সংঘর্ষ হয়েছে। আর কলম্বিয়ায় বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার অভিযোগ উঠেছে।

ফ্রান্স

ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভের সূত্রপাত গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে ক্রেতেই শহরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে। শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে শিক্ষকেরা আন্দোলন শুরু করেন। পরে শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দেন। একপর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা ছাড়িয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের একাংশ সহিংস হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন দেওয়া হয়।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গত সপ্তাহান্ত থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭৪ জনকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে এবং ৯০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চলছে।

বিক্ষোভের নতুন কর্মসূচির আগে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বৃহস্পতিবার বলেন, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্বীকৃত সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তন করা হতে পারে। লিওঁসহ কয়েকটি শহরে শনিবারের বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলা

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে বৃহস্পতিবার হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁদের প্রধান দাবি, অবাধ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন এবং বিরোধী নেত্রী ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কারিনা মাচাদোকে দেশে ফিরতে দেওয়া। মাচাদো বর্তমানে নির্বাসনে রয়েছেন।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাকাসে প্রায় দুই হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হন। দেশের অন্য এলাকাতেও বিক্ষোভ হয়েছে।

বিরোধী দলীয় সমর্থক এরিকা সেদেনো এএফপিকে বলেন, তারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন এবং মাচাদোকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছেন। আর দরজি মায়রিম বেলত্রান বলেন, তারা ক্লান্ত এবং সত্যিকারের পরিবর্তন চান।

Manual3 Ad Code

কলম্বিয়া সীমান্তবর্তী তাচিরা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বলিভারেও বিক্ষোভ হয়েছে। তাচিরায় বিক্ষোভকারীদের সমাবেশস্থলে যাওয়ার সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় তারা প্রতিবাদ জানান।

সার্বিয়া

সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে বৃহস্পতিবার সরকারবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সমর্থনে বড় সমাবেশ হয়েছে। আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত এ সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। তাদের লক্ষ্য, আলেকসান্দার ভুসিচের নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টিকে নির্বাচনে পরাজিত করা।

Manual4 Ad Code

২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরের রেলস্টেশনের ছাউনির একটি অংশ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর দুর্নীতির তদন্ত ও জবাবদিহির দাবিতে শিক্ষার্থী আন্দোলন শুরু হয়। প্রায় দুই বছর ধরে চলা আন্দোলনে পরে আগাম নির্বাচনের দাবিও যুক্ত হয়।

আন্দোলনের চাপের মুখে গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন ভুসিচ। তবে তিনি রাজনীতি ছাড়েননি। এবার নিজের দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্টস লিস্ট’ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জনমত জরিপে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান কম থাকার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেশটির মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে ভোটের পর অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মারিয়া নেদেলকোভিচ রাদিচ বলেন, তরুণেরা তাকে নতুন করে আশা দেখিয়েছেন এবং দেশে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন।

তিউনিসিয়া

তিউনিসিয়ার রাজধানীর উপকণ্ঠে ইততাদামেন এলাকায় পুলিশি হেফাজতে এক ব্যক্তির মৃত্যুর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ হয়েছে। ওই ব্যক্তিকে মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে আটক করা হয়েছিল।

পরিবারের অভিযোগ, আটকের পর পুলিশি নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। তারা ঘটনার তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেছেন। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য, মাদকদ্রব্য গিলে ফেলার পর ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করেন, টায়ারে আগুন দেন এবং পুলিশের দিকে পাথর ছোড়েন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। নিরাপত্তা বাহিনী এলাকার একটি ন্যাশনাল গার্ড স্টেশন সুরক্ষিত রাখারও চেষ্টা করে।

দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের স্ফাক্স গভর্নরেটের জেবিনিয়ানা শহরেও এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘিরে বিক্ষোভ হয়েছে। স্বজনদের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে তার মৃত্যু হয়। সেখানে বিক্ষোভকারীরা একটি গাড়িতে আগুন দেন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান।

স্ফাক্স শহরে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় তার সহপাঠীরাও বিক্ষোভ করেছেন। হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত ওই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নিতে অ্যাম্বুলেন্স দেরিতে আসায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ সহপাঠীদের। চিকিৎসাসেবার ঘাটতির প্রতিবাদে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন।

Manual1 Ad Code

জীবনযাত্রার মান, সরকারি সেবা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে এসব বিক্ষোভ হচ্ছে। এর আগে ১৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের পদত্যাগের দাবিতে কয়েক বছরের মধ্যে বড় বিক্ষোভ হয়।

জার্মানি

জার্মানির ২১টি শহরে আগামী ৩১ অক্টোবর বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তরুণদের সংগঠন ‘জেন জেড রেগেল্ট’। শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য ও বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরুদ্ধে এ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এতে হাজারো মানুষ অংশ নেবেন।

Manual8 Ad Code

সম্ভাব্য বিক্ষোভ ঘিরে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পুলিশের আশঙ্কা, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে আয়োজকেরা জানিয়েছেন, মানুষ বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতার বিরোধী তারা।

সুত্র: প্রথম আলো