অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটে বৃহস্পতিবার (১লা অক্টোবর) সকাল থেকে হবিগঞ্জজুড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শত শত যাত্রী। জেলার অভ্যন্তরীণ ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রুটে বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় অনেকেই বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়েছেন যাত্রা বাতিল করতে।
ভোগান্তিতে পড়া যাত্রীদের একজন শাহানা আক্তার। অসুস্থ সন্তানের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরীক্ষা করাতে এবং সিলেটের শাহপরাণ এলাকায় থাকা স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে ভোরে ছোট ছোট সন্তানকে নিয়ে বানিয়াচং থেকে হবিগঞ্জ শহরে আসেন তিনি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হবিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখেন, কোনো বাসই চলছে না।
শাহানা বলেন, মা হিসেবে ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ভ্রমণ করাই যথেষ্ট কঠিন। তার ওপর আমার একটি অসুস্থ সন্তান আছে, যার ডাক্তারি পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। আমাকে স্বামীর কাছেও পৌঁছাতে হবে। এতদূর এসে সব বাস চলাচল বন্ধ দেখে আমি পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ এবং গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না। আমি শুধু চাই, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যেন সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনা করেন বিশেষ করে অসুস্থ শিশু, নারী, বয়স্ক মানুষ এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী মানুষের কথা।
মৌলভীবাজারে হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার- সিলেট রুটে চলাচলকারী বাস আটকে রাখা এবং পরিবহন শ্রমিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির অভিযোগের প্রতিবাদে এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই হবিগঞ্জ জেলা থেকে কোনো স্থানীয় বা দূরপাল্লার গণপরিবহন ছেড়ে যায়নি।
এতে বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গন্তব্যে যেতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
সিলেটগামী যাত্রী শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি আগেই ট্রেনের টিকিট কিনেছিলেন। কিন্তু পরিবহন বন্ধ থাকায় শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে পৌঁছাতে পারেননি।
আমার জরুরি কাজ আছে এবং আমাকে দ্রুত যেতে হবে। কিন্তু রেলস্টেশনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। ফিরে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই, তিনি বলেন।
আরেক যাত্রী নাসরিন আক্তার বলেন, ছোট সন্তানকে নিয়ে সকাল থেকে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছেন তিনি।
সকাল থেকে বাসস্ট্যান্ডের আশপাশে ঘুরছি। এই পরিস্থিতিতে ছোট একটি শিশুকে নিয়ে যাতায়াত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষকে এভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হবে—এটা কাম্য নয়, তিনি বলেন।
হবিগঞ্জ মোটর ওনার্স গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, মৌলভীবাজারে এসএমএস ট্রান্সপোর্ট গ্রুপের সঙ্গে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলছে।
তিনি অভিযোগ করেন, হবিগঞ্জ মোটর ওনার্স গ্রুপের ‘নন-স্টপ এক্সপ্রেস’ বাসের চালক ও শ্রমিকদের শেরপুরে আটকে রাখা হয়েছে, যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের মারধর করা হয়েছে। তাদের তিনটি বাস বর্তমানে এসএমএস ট্রান্সপোর্ট গ্রুপের কার্যালয়ের সামনে আটকে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এসব ঘটনার অবসান এবং পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী হবিগঞ্জের বাস চলাচল নির্বিঘ্ন করার দাবিতে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে বলে জানিয়েছেন তারা।
তবে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং এসএমএস বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম রিপন হবিগঞ্জ পরিবহন মালিকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, বিরোধটি সমাধানের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু পরে হবিগঞ্জ মোটর ওনার্স গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রীমঙ্গলে এসএমএস পরিবহনের একটি কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুর চালান বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল এবং আমরা সমাধানের দিকে এগোচ্ছিলাম। কিন্তু হামলা ও ভাঙচুরের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেছে, তিনি বলেন।
হবিগঞ্জ, শায়েস্থাগঞ্জ হয়ে বাহুবল সহ ধর্মঘট এলাকায় ধর্মঘট কে ঘিরে মহাসড়কে পুলিশের সতর্ক অবস্থান ছিল।
এদিকে ধর্মঘট চলাকালে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
শ্রীমঙ্গল-সাতগাঁও হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মমিনুল ইসলাম বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সরাসরি আলাপকালে রেডটাইমস নিউজকে বলেন, তিনি ও তার টিম কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়ি পয়েন্টে অবস্থান করছেন।
তিনি জানান, সেখানে দূরপাল্লার বেশ কয়েকটি বাস আটকে থাকতে দেখা গেছে। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বাইপাস এলাকাতেও।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো ভাঙচুর বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানান ওসি মমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, শ্রমিকরা কিছু বাস ১০ থেকে ১৫ মিনিট, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩০ মিনিট পর্যন্ত আটকে রেখে পরে ছেড়ে দিচ্ছেন।
যেকোনো ধরনের নাশকতা, দুর্ঘটনা বা ভাঙচুর এড়াতে তিনি ও তার টিম সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বলেও জানান ওসি।
এদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরোধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর। ধর্মঘটের কারণে আটকে পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগ কখন শেষ হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
শাহানার কাছে অবশ্য এসবের চেয়েও বড় বিষয় তার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো।
তিনি বলেন, আমার একমাত্র ইচ্ছা, আমার সন্তান যেন সুস্থ হয়ে ওঠে, আমরা যেন নিরাপদে আমার স্বামীর কাছে পৌঁছাতে পারি এবং আমার সন্তান যেন প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরীক্ষা ও চিকিৎসা পায়। আল্লাহ যেন সবার কষ্ট লাঘব করেন।