সাধু-ভক্ত আর দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি। ১৭ অক্টোবর মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। এ উপলক্ষে কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে জড়ো হতে শুরু করেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাউল-ফকির, সাধু-গুরু, লালনভক্ত ও দর্শনার্থীরা। তাঁদের পদচারণ, গানের সুর আর ভাববিনিময়ে মুখর হয়ে উঠছে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ। বসেছে সাধুসঙ্গের ঐতহ্যবাহী আসর ।
তিরোধান দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন করেছে লালন একাডেমি। এ আয়োজনের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
এ আয়োজন কেবল একটি স্মরণোৎসব কিংবা গ্রামীণ মেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের সাধুসঙ্গের ঐতিহ্য, গুরু-শিষ্যের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক, আত্মসাধনা এবং জাত-পাত ও ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে দেখার দর্শন। লালন সাঁইয়ের গান ও জীবনদর্শনকে ধারণ করে প্রতিবছর এখানে মিলিত হন নানা শ্রেণি-পেশা ও বিশ্বাসের মানুষ।
আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, লালনকে স্মরণ করতে সাজসজ্জা, মরা কালিগঙ্গা নদীর তীরে মঞ্চ নির্মাণ, মাঠ প্রস্তুত, বসেছে গ্রামীণ মেলা। আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে বসেছেন লালনভক্ত বাউল-সাধকরা। কেউ গাইছেন লালনের গান, কেউ ব্যস্ত ভাবের আদান-প্রদানে।
আখড়াবাড়ির খাদেম মোহাম্মদ শাহ আলী জানান, শনিবার সন্ধ্যায় গুরুকার্য দিয়ে শুরু হবে সাধুসঙ্গ। এরপর হবে রাখাল সেবা ও মধ্যরাতে অধিবাস। রোববার ভোরে বাল্যসেবা এবং দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গ শেষ হবে।
চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা ফকির শান্ত বলেন, ‘সারা বছর এই দিনের অপেক্ষায় থাকি। তিরোধান দিবসে দেশ-বিদেশের বাউল ও সাধুরা আখড়াবাড়িতে আসেন। একে অপরের মধ্যে ভাববিনিময় হয়।’

মানিকগঞ্জ থেকে আসা সাধু ফজলুল হক বলেন, ‘সাঁইজির প্রেমের টানে, মায়ার টানে কয়েক দিন আগেই আখড়াবাড়িতে এসেছি। তিন দিন অনুষ্ঠান হবে। আসতে পেরে খুশি।’
আয়োজক কমিটির সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলার উদ্বোধন হবে ১৭ অক্টোবর। এ আয়োজনকে সামনে রেখে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় মঞ্চ, সাজসজ্জা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ প্রয়োজনীয় সকল কার্যক্রম সম্পন্ন।
এদিকে মেলার নিরাপত্তার জন্য কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে নিয়মিত টহল কার্যক্রম চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মেলা শুরুর আগে থেকেই পুলিশের প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি মেলার মাঠ ও মাজার এলাকায় টহল দল দায়িত্ব পালন করছেন। উৎসব চলাকালে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন জেলা পুলিশ।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘এবার লালন উৎসব মাদকমুক্ত করতে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় নিয়মিত অভিযান চলছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রায় দুই হাজার পিস গাঁজা সেবনের কলকে জব্দ করা হয়েছে। মাদক প্রতিরোধে প্রতিদিনই এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
জেলা প্রশাসন ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহায়তায় প্রায় ২০০ পুলিশ সদস্য নিয়ে মাদক বিরোধী অভিযান চালানো হয়। মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘এবার মাদকমুক্ত লালন উৎসব করতে পুলিশ ও প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি।