যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ব্যবধান বাংলাদেশের রফতানি ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য বলছে— এশিয়ার রফতানিনির্ভর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে মধ্যম ঝুঁকির স্তরে। কিন্তু তৈরি পোশাকনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই অবস্থান মোটেও স্বস্তির নয়— বরং এটি একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের ওপর পাল্টা শুল্ক ব্যবধান সর্বোচ্চ ৩৪ শতাংশ। দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে আধিপত্য বিস্তার এবং কৌশলগত দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন এটি। তবে চীনের এই চাপ পরোক্ষভাবে অন্য দেশগুলোর জন্যও নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের ওপর পাল্টা শুল্ক ব্যবধান সবচেয়ে কম ১৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, পাশাপাশি একাধিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধা এতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অপরদিকে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ১৯ শতাংশ। এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক, কৃষিপণ্য ও হালকা শিল্পপণ্যের বড় সরবরাহকারী হলেও বাণিজ্য ঘাটতি, ভর্তুকি নীতি এবং বাজার প্রবেশসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে শুল্কচাপে পড়ছে।
বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক ব্যবধান ২০ শতাংশ। তৈরি পোশাকনির্ভর এই দুই দেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার হলেও এই শুল্ক ব্যবধানের কারণে মূল্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ক্রমেই চাপে পড়ছে। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর প্রেক্ষাপটে এই চাপ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ২০ শতাংশ শুল্ক ব্যবধান সরাসরি রফতানি আদেশ, মূল্যছাড় এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ভিয়েতনামও একই শুল্কচাপে থাকলেও তাদের বিস্তৃত এফটিএ নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও বহুমুখী রফতানি কাঠামো তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রাখছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কাঠামো এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈষম্য তৈরি করেছে। যেখানে চীন সবচেয়ে বেশি চাপে, সেখানে বাংলাদেশসহ মধ্যম স্তরের দেশগুলোর জন্য এখন কূটনৈতিক তৎপরতা, বাণিজ্য সংস্কার এবং বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানো ছাড়া বিকল্প খুব বেশি নেই।
বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পোশাক খাত
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশ হলেও পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাত ক্রমবর্ধমান চাপে পড়ছে। উৎপাদন কাঠামো, কাঁচামাল নির্ভরতা, দীর্ঘ লিড টাইম, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে বাজার ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Manual1 Ad Code
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের (বিএই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “চীনকে বাদ দিলে বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের শীর্ষ পোশাক উৎপাদক দেশগুলোর একটি। ভলিউম, ভ্যালু ও টেকসই উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে। বিশ্বের সর্বাধিক লিড গ্রিন ফ্যাক্টরিও বাংলাদেশে।”
তিনি বলেন, ‘‘বড় ও বাল্ক অর্ডার সামলানোর সক্ষমতা বাংলাদেশের বড় শক্তি। তবে একইসঙ্গে এই নির্ভরতা ঝুঁকিও তৈরি করছে। কারণ দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বৈশ্বিক মন্দা বা অর্ডার কমলে পুরো অর্থনীতিই চাপে পড়ে।’’
ছোট অর্ডার ও দ্রুত ডেলিভারিতে পিছিয়ে
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা দ্রুত বদলাচ্ছে। ছোট অর্ডার, দ্রুত ডেলিভারি এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে ঝুঁক বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও মূলত বেসিক ও মিড-ক্যাটাগরির বাল্ক অর্ডারে অভ্যস্ত। মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বাজারে নেতৃত্ব দিতে হলে সব ক্যাটাগরিতে খেলতে হবে—ডিজাইন, গবেষণা, উন্নত ফেব্রিক ও অ্যাকসেসরিজে যেতে হবে। কিন্তু এখানেই আমাদের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ দুর্বল।”
কাঁচামালের বড় অংশ চীন থেকে আমদানিনির্ভর হওয়ায় লিড টাইম বেড়ে যায়। কাস্টমস, বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার ধীরগতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার মতো দেশে— যেখানে আমদানি-রফতানি দ্রুত সম্পন্ন হয়, সেখানে বাংলাদেশ এখনও সময়ক্ষয়ী প্রক্রিয়ায় আটকে আছে।
Manual3 Ad Code
এফটিএ ও ভারতের অগ্রগতি
২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ভারত ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউএইসহ মোট ৯টি বড় বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত কেবল ভুটানের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে, আর জাপানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
রুবেলের ভাষায়, “ভারত শুধু চুক্তিতেই এগোয়নি, বরং টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল খাতে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। আজকের অগ্রগতি আসলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল।”
রফতানি আয় কমছে, পোশাকে ধস
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের মোট রফতানি আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। জানুয়ারি মাসে ৪৪১ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হলেও গত বছরের একই মাসের তুলনায় তা কমেছে দশমিক ৫০ শতাংশ।
এই সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। যদিও চামড়া, পাট, হোম টেক্সটাইল ও কিছু প্রকৌশল পণ্যে আংশিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তবে প্রধান খাত পোশাকে মন্দা সামগ্রিক চিত্রকে নেতিবাচক করে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাড়লেও ইউরোপে চাপ
দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৫২২ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি।
Manual1 Ad Code
দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার জার্মানিতে একই সময়ে রফতানি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। সাত মাসে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ২৮৫ কোটি ডলারের পণ্য, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি ছিল ৩১৮ কোটি ডলার।
নির্বাচন ও ভূরাজনীতির প্রভাব
রফতানি খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘‘ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিরতা হতে পারে— এমন আশঙ্কায় কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা তাদের ক্রয়াদেশের একটি অংশ অন্য দেশে সরিয়ে নিয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে এসব ক্রয়াদেশ পুনরায় ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়।’’
সামনে পথ কোনটি
Manual6 Ad Code
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাইরে নতুন বাজার খোঁজা, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়া, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি ছাড়া বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য সামনে পথ কঠিন।