আজ মঙ্গলবার, ১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্র নয়, ‘কর্তৃত্ববাদ’: দ্য প্রিন্টকে হাসিনা

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৮:০৫ অপরাহ্ণ
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্র নয়, ‘কর্তৃত্ববাদ’: দ্য প্রিন্টকে হাসিনা

Manual2 Ad Code

অনলাইন নিউজ ডেস্ক

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে একে ‘রূপান্তরের মোড়কে কর্তৃত্ববাদ’ বলেছেন চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা, যার ১৬ বছরের শাসনামলকে বিরোধীরা ‘ফ্যাসিবাদী শাসন’ বলে থাকে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় প্রতিটি প্রাণহানির জন্য তিনি ‘দুঃখিত’।

তবে সেই সহিংসতার বিচারিক তদন্ত ‘সীমিত’ করে ফেলা হয়েছে অভিযোগ করে সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করেছেন তিনি।

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক দফায় রূপ নেওয়া ওই অভ্যুত্থান ঘিরে প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণ গেছে বলে উঠে এসেছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে।

আন্দোলন দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে শেখ হাসিনাকে ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

Manual1 Ad Code

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই শেখ হাসিনা অবস্থান করছে দিল্লিতে, আদালতের দৃষ্টিতে এখন তিনি পলাতক ফাঁসির আসামি।

ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরও বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। সেই বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউনূস সরকার।

কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না সবচেয়ে বেশি সময় দেশ শাসন করা দলটি।

শেখ হাসিনা বলছেন, তার দলকে নিষিদ্ধ করা মানে আসন্ন নির্বাচনে “কয়েক কোটি বাংলাদেশির ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া।”

প্রিন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এ ধরনের একটা পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে তাকে মুক্ত, সুষ্ঠু বা বৈধ বলা যায় না। পছন্দের দল বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ভোটারদের থাকতে হবে; কাউকে ভোটে অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া বা ঘরে ঘরে গিয়ে সহিংসতার হুমকি দিয়ে বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করা চলতে পারে না।”

Manual1 Ad Code

আওয়ামী লীগ সভাপতির দাবি, “অন্তর্বর্তী সরকার জানে, আমাদের নির্বাচন করতে দেওয়া হলে আমরা বিপুল সমর্থন পেতাম। এ কারণেই আমাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

“ভুলে গেলে চলবে না, ইউনূস নিজে কখনও বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে একটি ভোটও পাননি, অথচ তিনি নিজের বেআইনি কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে দেশের আইনগত কাঠামো নতুন করে লিখেছেন।”

লিখিত সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, “দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে গণতান্ত্রিক বৈধতা দাবি করা যায় না। এটি সংস্কার নয়; রূপান্তরের মোড়কে কর্তৃত্ববাদ।”

ইউনূস বরাবরই বলে আসছেন, আওয়ামী লীগকে ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়নি; তাদের ‘রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

তবে হাসিনার ভাষ্য, ওই পার্থক্য ‘অর্থহীন’ কারণ তার দল প্রচার চালাতে, সংগঠিত হতে বা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।

Manual4 Ad Code

নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান

ট্রাইব্যুনালের মামলায় জুলাই আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট ৫ অভিযোগ আনা হয়েছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।

তবে তার দাবি, রাষ্ট্রের ‘প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা’ এবং ‘প্রাণহানি ঠেকানোর’ তাগিদ থেকেই তার সরকার তখন কাজ করেছে।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া বৈধ আন্দোলনকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি এবং শান্তিপূর্ণভাবে এগোতে দিয়েছি। তাদের দাবির কথা শুনেছি এবং সরকারি চাকরির কোটা বাতিল করেছি, যা ছিল তাদের হতাশার কারণ।”

ওই আন্দোলনের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ এবং থানায় আক্রমণের প্রসঙ্গ ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “যা আমরা আঁচ করতে পারিনি, তা হল উগ্রবাদী শক্তি ওই আন্দোলন হাইজ্যাক করে নিয়েছিল। এটা আর স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না।”

সে সময় সহিংসতার তদন্তে কমিটি করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আর এগোয়নি।

বিষয়টি নিয়ে ‘হতাশা’ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, “ইউনূস ক্ষমতায় এসেই ওই তদন্ত ভেঙে দেন—নিশ্চয় তিনি জানতেন, এতে তার ‘মেটিকুলাস প্ল্যান’ উন্মোচিত হয়ে যাবে। তার ওই সিদ্ধান্তই আন্দোলনের পেছনের উদ্দেশ্য ও ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে, বিদেশি সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সামনে আনে। এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।”

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

Manual8 Ad Code

আইন-শৃঙ্খলার আরও অবনতি ঠেকাতে ‘সব দলের’ অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দ্রুত ‘সংবিধানিক শাসনে’ ফেরার দাবি জানিয়েছেন শেখ হাসিনা, যার অধীনে গত তিনটি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

হাসিনার ভাষ্য, “ভয় দেখিয়ে বা বেছে বেছে আইন প্রয়োগ করে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা যায় না।”

এক মাস আগে শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে রাতভর সহিংসতা চলে, আক্রান্ত হয় দুটি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়, ছায়ানটের মত প্রতিষ্ঠান।

সেই প্রসঙ্গ ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “এটা ম্যান্ডেটহীন একটি অনির্বাচিত প্রশাসনের সরাসরি ফল। তারা রাজনীতিকে চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়েছে। সংস্কারের বদলে উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে তুলে এনেছে, মবের বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বৈধ রাজনীতির কণ্ঠরোধ করেছে।”

অবশ্য আওয়ামী লীগই দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে আসছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযোগ। হাদিকে হত্যার পেছনে যাদের দায়ী করা হচ্ছে, তারাও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত বলে পুলিশের ভাষ্য।

শেখ হাসিনা বলেন, “আজকের বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার কোনো ছাপ নেই। ইউনূস সরকার নিয়মিতভাবে সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার বদলে তারা উগ্রবাদীদের উৎসাহ জুগিয়েছে—যারা প্রতিদিনের নৃশংসতার মাধ্যমে তাদের কট্টর মতাদর্শ ছড়াচ্ছে, সমাজের বহুত্ববাদ দমন করছে এবং ভিন্নমতকে রাজনৈতিক শত্রু বলে চিহ্নিত করছে।”

সংবিধান সংস্কারের যে উদ্যোগ বাংলাদেশে নেওয়া হয়েছে, তারও সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য চরমপন্থি গোষ্ঠীর পুনর্বাসন আমাদের জাতির কাঠামোকেই হুমকির মুখে ফেলছে। উগ্র গোষ্ঠীকে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরতে দিলে তারা রাষ্ট্রকে সংযত করে না; তারা নিজেদের ছাঁচে ঢালতে চায় এবং বহুত্ববাদের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে চায়।”

বাংলাদেশ যে পথে যাচ্ছে, তা সমাজে বিভক্তি এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।

তার ভাষায়, ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সহিংসতা’ চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক মিত্ররা ‘বসে থাকবে না’।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ‘ইতিহাস বিকৃতির’ অভিযোগ করেন হাসিনা।

তিনি বলেন, “আজ আমরা যা দেখছি, তা ইতিহাসের সত্যকে পরিকল্পিতভাবে মুছে দেওয়ার চেষ্টা। উগ্রপন্থি শক্তি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতার বাস্তবতাকে লঘু করতে চেয়েছে—ভুক্তভোগী ও হানাদারের পার্থক্য মুছে দিতে চেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই সত্য অস্বস্তিকর হতে পারে; তারা আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখাতে চায়। কিন্তু সত্য তো সত্যই।”