আজ সোমবার, ১৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন ভারত থেকে দেশে ফেরার ছক কষছেন আওয়ামী লীগ নেতারা

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৮:৪৬ অপরাহ্ণ
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন ভারত থেকে দেশে ফেরার ছক কষছেন আওয়ামী লীগ নেতারা

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দেশে অপরাধী এবং পলাতক হিসেবে বিবেচিত; মানবতাবিরোধী অপরাধ, খুন, রাষ্ট্রদ্রোহ কিংবা আত্মসাতের অভিযোগের মুখোমুখি। কিন্তু কলকাতার শপিং মলের ভিড়ে খাবারের দোকানে, ব্ল্যাক কফি আর ভারতীয় ফাস্ট ফুডের তৃপ্তি ছেড়ে আওয়ামী লীগের নির্বাসিত রাজনীতিবিদরা দেশে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ছক কষছেন।

১৬ মাসেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সংঘটিত এক গণঅভ্যুত্থান তাকে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। বিক্ষোভকারীরা তার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হলে তিনি উড়োজাহাজে করে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি যে রাজপথ রেখে গিয়েছিলেন তা ছিল রক্তাক্ত। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ওপর তার সরকারের শেষ দমন-পীড়নে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন।

গণঅভ্যুত্থানের পর তার দলের হাজার হাজার সদস্যও পালিয়ে যান। ক্ষমতায় থাকাকালীন বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে জনগণের সহিংসতা ও ক্রমবর্ধমান ফৌজদারি মামলার মুখে পড়েন তারা। আওয়ামী লীগের ৬০০ জনের বেশি নেতা ভারতের সীমান্তঘেঁষা শহর কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন এবং তখন থেকেই সেখানে লুকিয়ে আছেন।

Manual3 Ad Code

আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম ও সংগঠনটিকে টিকিয়ে রাখতে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গত বছরের মে মাসে জনগণের চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করে। হত্যা ও দুর্নীতিসহ একাধিক অপরাধের অভিযোগে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার চলাকালে দলের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। শেখ হাসিনার পতনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির প্রথম নির্বাচনে দলটির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রচারণাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষের দিকে ওই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

তবুও নিজের রাজনৈতিক জীবনের ইতি মানতে নারাজ শেখ হাসিনা। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং প্রকাশ্যেই ভারত থেকে ফিরে আসার ছক কষছেন। আসন্ন নির্বাচন ভণ্ডুল করতে হাজার হাজার সমর্থককে সংগঠিত করার চেষ্টাও করছেন।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা এক গোপন আশ্রয় থেকে শেখ হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলীয় বৈঠক ও বাংলাদেশে অবস্থারত নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে আলাপ করেন। তার এই রাজনৈতিক তৎপরতা ভারত সরকারের সতর্ক নজরদারির মধ্যেই চলছে; যে সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল এবং যারা তাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ পরিষ্কারভাবে উপেক্ষা করে চলেছে।

গত এক বছরে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীসহ শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত কলকাতা থেকে ডেকে এনে শেখ হাসিনার সঙ্গে দলীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।

তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে থাকা আমাদের মানুষদের সঙ্গে—দলীয় কর্মী, নেতা, তৃণমূল নেতা এবং অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখছেন। তিনি আসন্ন লড়াইয়ের জন্য দলকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছেন। অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলা রয়েছে। তবে ছাত্রলীগের এই নেতা তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সাদ্দাম বলেন, ‘‘কখনও কখনও তিনি দিনে ১৫ কিংবা ১৬ ঘণ্টা ধরেও ফোনালাপ ও বৈঠক করেন। আমাদের নেত্রী খুব আশাবাদী, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা বীরের মতো ফিরে আসবেন।’’

শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত গত দুটি নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

তবে আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলে গণতান্ত্রিক বৈধতার সব দাবিই ক্ষুণ্ন হয়ে যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অভিযোগ তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে নিজের প্রতিশোধমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন তিনি। যদিও ড. ইউনূস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আমরা কর্মীদের বলছি, নির্বাচনের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়ানো যাবে না। সব ধরনের প্রচারণা ও ভোট বর্জন এবং এই ভুয়া প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। আওয়ামী লীগের এই নেতার বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে; যা তিনি অস্বীকার করেছেন।

বাংলাদেশে যারা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী ও লুটেরা শাসনের জন্য দায়ী করেন, তাদের কাছে হঠাৎ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে দলটির অবস্থান গভীর সংশয়ের সৃষ্টি করেছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বহু বছরের নথিতে দেখা গেছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে সমালোচক ও বিরোধীদের নিয়মিত দমন করা হতো; হাজার হাজার মানুষ গুম, খুন, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালায় আটকা ছিলেন। যাদের অনেকেই হাসিনার পতনের পর কেবল মুক্তি পান। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বকীয়তা ভেঙে পড়েছিল এবং নির্বাচন পরিণত হয়েছিল সাজানো প্রহসনে।

শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার নামে দেশজুড়ে গণ-সহিংসতার ঢেউ বয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছে, তাদের শত শত কর্মী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দ্বারা আক্রান্ত, নিহত হয়েছেন অথবা জামিন ছাড়াই কারাগারে আটক রয়েছেন। তাদের অনেক কর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন। সাদ্দাম বলেন, আমরা জেলের ভয়ে কলকাতায় থাকি না। আমরা এখানে আছি, কারণ আমরা যদি ফিরে যাই, তাহলে আমাদের হত্যা করা হবে।

• ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন

কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতের জন্য ক্রমেই অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্থগিত একটি দলকে তাদের ভূখণ্ড থেকে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া এবং বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড রাজনৈতিক পলাতক নেতাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। তবে কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, ভারত থেকে প্রত্যাবাসনের কোনও আশঙ্কা তারা দেখছেন না।

গত সপ্তাহে এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন চরমে পৌঁছায়। ওই সময় দিল্লিতে এক জনাকীর্ণ সমাবেশে শেখ হাসিনা তার প্রথম প্রকাশ্য ভাষণ দেন। বাঙ্কার থেকে রেকর্ড করা অডিও বার্তায় তিনি আসন্ন নির্বাচনের নিন্দা এবং ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘জোর করে ক্ষমতা দখল’ ও বাংলাদেশকে ‘রক্তে ভেজা দেশ’ বানানোর অভিযোগ তোলেন।

Manual4 Ad Code

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার প্রকাশ্য ভাষণের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘‘ভারতের রাজধানীতে এই অনুষ্ঠান আয়োজনের এবং গণহত্যাকারী হাসিনাকে প্রকাশ্যে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়াটা বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা।’’ তবে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এই বিষয়ে কোনও জবাব দেয়নি।

কলকাতায় আরামদায়ক বাসভবন থেকে দলটির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তাদের শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তেমন অনুশোচনা কিংবা আত্মসমালোচনা করতে দেখা যায়নি। অধিকাংশ নেতাই ক্ষমতা হারানোর পেছনে যে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে, তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বরং এই অভ্যুত্থানকে ছোট একটি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম কলকাতা উপশহরে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টিত আবাসনের বিলাসবহুল ভিলায় বসবাস করছেন। সেখান থেকে তিনি বলেন, এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল না, এটা ছিল আমাদের গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের জন্য সন্ত্রাসীদের দখল।

দেশে তার বিরুদ্ধে আনা হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের জবাবে হেসে ওঠেন তিনি। বলেন, ‘‘ভুয়া, ভুয়া, ভুয়া।’’

Manual6 Ad Code

আসন্ন নির্বাচনের ব্যর্থতার ওপর নির্বাসিত নেতাদের প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা অনেকটাই নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন। দলটির নেতাদের দাবি, এই নির্বাচন দেশে স্থিতিশীলতা কিংবা শান্তি আনবে না এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে আবার আওয়ামী লীগের দিকেই ফেরাবে।

Manual1 Ad Code

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কলকাতায় বসবাস করা আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় হাতে গোনা কয়েকজনের একজন, যিনি অতীতের ‘ভুল’ স্বীকার করতে রাজি আছেন বলে জানিয়েছেন। জয় বলেন, ‘‘আমি স্বীকার করতে পারি, আমরা সাধু ছিলাম না। আমরা কর্তৃত্ববাদী ছিলাম। পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিলাম না। আমি একমত, ২০১৮ সালের নির্বাচন পুরোপুরি কার্যকর ছিল না। আমরা চেয়েছিলাম এটা আরও ন্যায্য ও স্বচ্ছ হোক; দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি।’’

দুর্নীতি ও লুটপাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অবশ্যই, অনিয়ম ছিল। কিছু আর্থিক বিষয় ছিল; যা হওয়া উচিত ছিল না। এর দায় আমাদের নিতে হবে। তবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আনুমানিক ২০০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

কলকাতায় থাকা অনেকের মতো জয়ও জোর দিয়ে বলেন, ভারতে তার নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরলে সম্ভবত কারাগারই তার অপেক্ষায় থাকবে।

তিনি বলেন, এখন আমাদের জন্য সময়টা খুব অন্ধকার। কিন্তু আমার মনে হয় না এটা দীর্ঘদিন থাকবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।