আজ বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভোটে বিএনপি-জামায়াত কেমন করতে পারে, রয়টার্সের বিশ্লেষণ যা বলছে

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০১:৩২ পূর্বাহ্ণ
ভোটে বিএনপি-জামায়াত কেমন করতে পারে, রয়টার্সের বিশ্লেষণ যা বলছে

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনের সময় রাজপথে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর উপস্থিতি ছিল খুবই কম। তারা কখনো নির্বাচন বর্জন করেছে, আবার কখনো শীর্ষ নেতারা ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তারের শিকার হওয়ায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আগামী বৃহস্পতিবারের ভোটকে সামনে রেখে এখন পরিস্থিতি পুরো উল্টো।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ। আর ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে তাঁর সরকার পতনে ভূমিকা রাখা অনেক তরুণ বলছেন, আসন্ন এই নির্বাচনই হবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির ২০০৯ সালের পর প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। ২০০৯ সালের ওই নির্বাচনে জিতেই শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসন শুরু হয়েছিল।

Manual4 Ad Code

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) এই নির্বাচনে জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। এরই মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সী জেন-জি কর্মীদের নিয়ে গড়া একটি নতুন দল (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। শেখ হাসিনাবিরোধী রাজপথের আন্দোলনে পাওয়া সমর্থনকে তারা ভোটের রাজনীতিতে রূপ দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর জামায়াতের সঙ্গে জোটের এই সিদ্ধান্ত নেয়।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেন, তাঁর দল সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তিনি জানান, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন তারা পাবে — এই বিষয়ে দলটি আত্মবিশ্বাসী।

Manual7 Ad Code

বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলে যদি কোনো দলের নিরঙ্কুশ বিজয় আসে, সেটাই বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে। বিভক্ত বা ঝুলন্ত ফল হলে দেশ আবার অস্থিরতার দিকে যেতে পারে। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতা ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে বড় শিল্প খাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত – যা বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক।

এই নির্বাচনের ফল দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে চীন ও ভারতের প্রভাবের দিকও নির্ধারণ করবে।

ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, ‘জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এগিয়ে আছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, এখনো বড় একটি অংশের ভোটার সিদ্ধান্তহীন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফলাফলের ওপর বেশ কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জেনারেশন জেড (জেন জি)। তারা মোট ভোটারের প্রায় এক–চতুর্থাংশ। তাদের ভোটের গুরুত্ব অনেক বেশি।’

সারা দেশে এখন রাস্তার খুঁটি, গাছ আর দেয়ালে ঝুলছে ও সাঁটা আছে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীক ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের সাদা-কালো পোস্টার ও ব্যানার। পাশাপাশি আছে কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারও। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় প্রতীক লাগানো অস্থায়ী কার্যালয় থেকে ভেসে আসছে প্রচারের গান।

Manual4 Ad Code

এ দৃশ্য আগের নির্বাচনের সঙ্গে পুরোপুরি ভিন্ন। তখন চারপাশজুড়ে শুধু আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকই দেখা যেত।

জনমত জরিপগুলো বলছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার যদি না-ও জেতে, তবু তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল করতে পারে। উল্লেখ্য, এই দলটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং সে সময় ভারত বাংলাদেশের পক্ষে ছিল।

Manual8 Ad Code

ভারতের প্রভাব কমছে, চীনের বাড়ছে

বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের রায় আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের ভূমিকা নির্ধারণ করবে। শেখ হাসিনাকে ভারতঘেঁষা হিসেবে দেখা হতো। তাঁর পতনের পর তিনি ভারতে চলে যান এবং এখনো সেখানেই আছেন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বেড়েছে।

অন্যদিকে, ভারতের প্রভাব কমছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, জামায়াতের তুলনায় বিএনপি ভারতের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে তারা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারে। পাকিস্তান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। পাশাপাশি জামায়াতের জেন-জি মিত্র দলটি বলেছে, বাংলাদেশে ‘নয়াদিল্লির আধিপত্য’ তাদের বড় উদ্বেগের বিষয়। দলটির নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।

ইসলামি নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে থাকা জামায়াতে ইসলামী বলেছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে নেই।

বিএনপির তারেক রহমান বলেছেন, তাঁর দল সরকার গঠন করলে সেই সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে, যারা ‘আমার জনগণ ও আমার দেশের জন্য উপযোগী প্রস্তাব দেবে।’

বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্যের হারও বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সমস্যায় পড়েছে। এর ফলে ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক অর্থায়ন নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া বিলিয়ন ডলারের ঋণও রয়েছে।

ঢাকাভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের এক জরিপে দেখা গেছে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দুর্নীতি। এরপরেই আছে মূল্যস্ফীতি।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তাদের ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’। তাদের ইসলামপন্থী অবস্থানের চেয়ে এই ভাবমূর্তিই বেশি প্রভাব ফেলছে।

জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটারদের ভোট দেওয়ার আগ্রহ বেশি। তারা ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয়গুলোর চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি তারা এমন নেতৃত্ব চান, যারা দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং জনগণের প্রতি আন্তরিক।

তবু সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপির তারেক রহমানকেই পরবর্তী সরকারপ্রধান হওয়ার সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে আসে, তাহলে তাদের সভাপতি শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকতে পারেন।

২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব, যিনি এবার প্রথমবার ভোট দেবেন, বলেন, তিনি আশা করেন নতুন সরকার মানুষকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেবে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, ‘সবাই (শেখ হাসিনার) আওয়ামী লীগে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। জাতীয় নির্বাচনে মানুষ ভোটই দিতে পারত না। মানুষের কোনো কথা বলার সুযোগ ছিল না। আমি আশা করি, পরবর্তী সরকার—যেই আসুক—এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।’

 

তথ্য সুএঃ ইনডিপেনডেন্ট