আজ শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে হামলা চালাতে চীনের স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে ইরান?

editor
প্রকাশিত মার্চ ১৩, ২০২৬, ০৩:৫৬ পূর্বাহ্ণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে হামলা চালাতে চীনের স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে ইরান?

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সম্পদের ওপর হামলা চালাতে চীনের স্যাটেলাইট ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে থাকতে পারে ইরান। গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা এমন ধারণাই প্রকাশ করেছেন।

ফ্রান্সের সাবেক বৈদেশিক গোয়েন্দা পরিচালক আলাইন জুইলেট চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সের স্বাধীন টোকসিন পডকাস্টকে বলেন, “চীন হয়ত ইরানকে ‘বাইডো’ স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার দিয়েছে। কারণ, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরান অনেক বেশি নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের একটি হল: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আট মাস আগের যুদ্ধের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল। এতে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে।”

গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এতে ইরানের শীর্ষ নেতারা নিহত হওয়ার পর ইরান পাল্টা হামলায় ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো এসব ক্ষেপণাস্ত্রের অনেকগুলো ঠেকাতে পারলেও সেগুলোর কিছু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের সরকারি-মালিকানাধীন গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমে (জিপিএস) প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে পারে বা সংকেত বিঘ্নিত করে রিসিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে, যার ওপর আগে ইরানের সামরিক বাহিনী নির্ভর করত।

Manual8 Ad Code

তবে ইরান যদি চীনের ‘বাইডো’ স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেই সংকেত বাধাগ্রস্ত করা কঠিন। যদিও ইরান এই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে কিনা তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি এবং এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।

‘বাইডো’ ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা কী?

মূলত যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস)-কে টক্কর দিতেই ‘বাইডো’ উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে চীন। ২০২০ সালে সর্বশেষ এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।

ওই বছর জুলাই মাসে চীনের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল- এ এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যবস্থা উদ্বোধন করেন।

১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর চীন নিজস্ব স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেয়। কারণ, চীনের আশঙ্কা ছিল, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন জিপিএস ব্যবহারে প্রবেশাধিকার সীমিত করতে পারে।

চীনে বাইডো’র জন্য সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হল বিশ্বকে সেবা দেওয়া এবং মানবজাতির উপকার করা।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অন্যান্য ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার তুলনায় বাইডো ব্যবস্থায় অনেক বেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হয়।

Manual8 Ad Code

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য বিশ্লেষণ ইউনিটের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থায় ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে, আর চীনের ব্যবস্থায় রয়েছে ৪৫টি।

বিশ্বের অন্য দুটি বড় ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা হল: রাশিয়ার গ্লোনাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও। সেগুলোতেও ২৪টি করে স্যাটেলাইট আছে।

আর বাইডো ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এ ব্যবস্থায় তিনটি প্রধান অংশ রয়েছে – মহাকাশ, স্থল এবং ব্যবহারকারী অংশ।

Manual5 Ad Code

স্থল অংশে বিভিন্ন ধরনের গ্রাউন্ড স্টেশন রয়েছে, যেমন- প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, সময় সমন্বয় ও আপলিংক স্টেশন, পর্যবেক্ষণ স্টেশন এবং আন্তঃস্যাটেলাইট সংযোগ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সুবিধা।

ব্যবহারকারী অংশে আছে বিভিন্ন ধরনের মৌলিক পণ্য, সিস্টেম ও সেবা। যেমন- চিপ, মডিউল, অ্যান্টেনা, টার্মিনাল, অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম এবং অ্যাপ্লিকেশন সার্ভিস।

অন্যান্য স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার মতো বাইডোও স্যাটেলাইট থেকে সময় সংকেত পাঠায়, যা মাটিতে থাকা বা যানবাহনে থাকা রিসিভার গ্রহণ করে। একাধিক স্যাটেলাইট থেকে সংকেত পৌঁছাতে কত সময় লাগছে তা মেপে রিসিভার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করে।

ইরান কি ‘বাইডো’ ব্যবহার করছে?

ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেনি। তাছাড়া, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় সামরিক কার্যক্রম স্থানান্তরিত করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে।

তবে জুনের ওই যুদ্ধের পর ইরানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে, “ইরান বিশ্বের বিদ্যমান সব সক্ষমতা ব্যবহার করে। একক কোনও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না।”

ফ্রান্সের সাবেক বৈদেশিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক জুইলেট টোকসিন পডকাস্টকে বলেন, চীনের বাইডো সিস্টেমে স্থানান্তরই ইরানের লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ার একমাত্র যৌক্তিক ব্যাখ্যা।

তিনি বলেন, “জিপিএস সিস্টেমের বদলে চীনা সিস্টেম ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে, যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত লক্ষ্যভেদের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে…গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি নিশানায় আঘাত লেগেছে।”

অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরান এই চীনা স্যাটেলাইট ব্যবস্থাকে সামরিক ক্ষেত্রে যুক্ত করার কাজ গত আট মাস নয়, বরং আরও দীর্ঘ সময় ধরে করছে।

চীন-ইরান সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক থিও নেনচিনি আল-জাজিরাকে জানান, ২০১৫ সালেই ইরান বাইডো-২ তাদের সামরিক অবকাঠামোতে যুক্ত করতে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল।

এর মূল লক্ষ্য ছিল জিপিএস-এর বেসামরিক সংকেতের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত সংকেত ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রের পথনির্দেশনা উন্নত করা।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালে চীন-ইরান কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির পর এই প্রক্রিয়া গতি পায়। ধারণা করা হয়, তখন চীন ইরানকে বাইডো-র এনক্রিপ্টেড সামরিক সিগন্যাল ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

এরপর থেকে ইরান তাদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নিরাপদ যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বাইডো-র ব্যবহার বাড়াতে শুরু করে। বাস্তবিক অর্থে, ২০২১ সাল থেকেই ইরান মার্কিন জিপিএস-এর ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে শুরু করে।

২০২৪ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলে ইরানের চালানো হামলার নির্ভুলতা দেখে অনেক বিশ্লেষক তখনই বাইডো-র কেন্দ্রীয় ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছিলেন।

তবে ধারণা করা হয়, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের ঠিক পরেই ইরান পরিবহন ও লজিস্টিকসসহ বেসামরিক ক্ষেত্রেও বাইডো-র ব্যবহার পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন করে।

নেনচিনি বলেন, “ওই (১২ দিন) যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ইরানের জন্য একটি মোড় পরিবর্তন ছিল, যা তেহরানকে গত বছর এই পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করেছে।”

নিখুঁত লক্ষ্যভেদে বাইডো-র ভূমিকা:

বাইডো ব্যবস্থায় ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে নিশানার দিকে পরিচালনা করতে পারে। বিশেষজ্ঞ ম্যাগনিয়ার আল জাজিরাকে ব্যাখ্যা করেন, আগে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মূলত ‘ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম’-এর ওপর নির্ভর করত।

এই পদ্ধতিতে জাইরোস্কোপ ও সেন্সর ব্যবহার করা হয়, যা বাইরের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধী হলেও দীর্ঘ দূরত্বে লক্ষ্যভেদে সামান্য ত্রুটি তৈরি করে। স্যাটেলাইট সিগন্যাল এই ত্রুটি সংশোধন করে লক্ষ্যভেদকে অনেক বেশি নির্ভুল করে তোলে।

একাধিক স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহারের বড় সুবিধা হলো জ্যামিং বা সংকেত বিঘ্নিত করার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। যদি একটি সিস্টেম জ্যাম করা হয়, তবে অন্যটি কাজ চালিয়ে যেতে পারে।

চীনের বাইডো সিস্টেমের ‘মার্জিন অব এরর’ বা ভুলের মাত্রা এক মিটারেরও কম। তাছাড়া এটি লক্ষ্যবস্তু সরে গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের দিক পরিবর্তন করতে পারে।

চীন-ইরান সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক থিও নেনচিনি বলেন, “এটি মার্কিন জিপিএস-এর বেসামরিক সিগন্যালের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত।”

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া মারিন্স জানান, ২০২৫ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার করা জিপিএস সিগন্যাল অচল করে দিয়েছিল। তবে বাইডো-৩ এর সামরিক সিগন্যাল বি৩এ মূলত জ্যাম করা অসম্ভব।

এছাড়া বাইডো-তে রয়েছে শর্ট মেসেজ টুল, যার মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পরও ২ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব।

কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ইরানের বাইডো ব্যবহার?

বিশ্লেষকদের মতে, বাইডো প্রযুক্তিতে ইরানের প্রবেশাধিকার যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। বিশ্লেষক ম্যাগনিয়ার মনে করেন, নিখুঁত হামলার সক্ষমতা আগে কেবল হাতেগোনা কয়েকটি দেশের ছিল, কিন্তু এখন বৈশ্বিক নেভিগেশন অবকাঠামো সেই সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

নেনচিনি মনে করেন, বাইডো-র এই কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও মার্কিন জিপিএস-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নেভিগেশন ব্যবস্থাকে বহুমুখী করার কথা ভাবতে পারে।

অন্যদিকে চীনও এই যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের প্রযুক্তির কার্যকারিতা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে।

ইরানের হাতে কত ক্ষেপণাস্ত্র আছে?

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারের সঠিক আকার অজানা থাকলেও এটি এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম ও উন্নত। জুইলেট বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অনেক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের দাবি করলেও সঠিক পরিমাণ ও বন্টন এখনও অজানা।

ইরান ফ্রান্সের চেয়ে তিনগুণ বড় একটি দেশ এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সারা দেশে ট্রাকের ওপর মোতায়েন থাকে। বিশাল এই এলাকায় সেই ট্রাকগুলো ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন।

Manual2 Ad Code

তেহরান সম্ভবত বর্তমান যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার কথা মাথায় রেখে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন আরও হিসেব কষে মোতায়েন করছে।

ওদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্বেগ বাড়ছে যে, ইরানের সস্তা শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করতে গিয়ে তাদের মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে।

তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর