জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক এক গোপন ভোটে কোস্টারিকার সাবেক উপরাষ্ট্রপতি রেবেকা গ্রিনস্প্যান সামান্য ব্যবধানে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন। তবে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের বিরোধিতার কারণে এখনও কোনো চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারিত হয়নি, যা নতুন প্রার্থীদের প্রতিযোগিতায় আসার সম্ভাবনা উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
Manual4 Ad Code
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আয়োজিত ষষ্ঠ এই অনানুষ্ঠানিক গোপন ভোটে ৭০ বছর বয়সি রেবেকা গ্রিনস্প্যান সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। তবে এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে এমন পাঁচ স্থায়ী সদস্য—রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের প্রত্যেকেই সব প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুটি বা তার বেশি ‘নিউৎসাহিত’ বা বিরোধিতাসূচক ভোট দেওয়ায় কোনো স্পষ্ট বিজয়ী উঠে আসেনি।
আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের হাতে আর তিন মাসেরও কম সময় বাকি রয়েছে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই কাউন্সিলে কোনো প্রার্থীর সুপারিশ নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে ৯টি ইতিবাচক ভোটের পাশাপাশি পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কারও কাছ থেকে কোনো ‘নিউৎসাহিত’ বা ভেটোসুলভ ভোট পাওয়া চলবে না। বর্তমান মহাসচিবকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিগত ৮ বছরেরও বেশি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালের অক্টোবরে গুতেরেসকে বেছে নিতেও ছয়টি স্ট্র বা অনানুষ্ঠানিক ভোটের প্রয়োজন হয়েছিল। এছাড়া জাতিসংঘের ৮০ বছরেরও বেশি ইতিহাসে কখনও কোনো নারী মহাসচিব পদে আসীন হননি।
নির্ধারক পর্যায়ে ভোটিং প্রক্রিয়া ও বর্তমান প্রার্থীরা
নির্বাচনী লড়াই এখন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নির্ধারক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। কারণ শুক্রবারের এই ভোটে প্রথমবারের মতো কালার-কোডেড বা রঙ-চিহ্নিত ব্যালট ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে ভেটো ক্ষমতাধর কোনো স্থায়ী সদস্য নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর বিরোধী কি না।
Manual3 Ad Code
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অনুষ্ঠিত পাঁচটি ভোটের মধ্যে চারটিতেই রেবেকা গ্রিনস্প্যান সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। একমাত্র আগস্ট মাসের একটি ভোটে গায়ানার জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যারোলিন রড্রিগেজ-বার্কেট শীর্ষ স্থান অর্জন করেছিলেন। শুক্রবারের ভোটেও এই সমীকরণে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। রেবেকা গ্রিনস্প্যান ৯টি ‘উৎসাহিত’, ৫টি ‘নিউৎসাহিত’ এবং ১টি ‘মতামত নেই’ ভোট পেয়েছেন, যার মধ্যে দুটি বিরোধিতাসূচক ভোট এসেছে স্থায়ী সদস্যদের কাছ থেকে।
অন্যদিকে, ক্যারোলিন রড্রিগেজ-বার্কেট ৮টি পক্ষে, ৬টি বিপক্ষে এবং ১টি মতামতহীন ভোট পেয়েছেন, যেখানে স্থায়ী সদস্যদের দুটি বিরোধিতা ছিল। জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও রড্রিগেজ-বার্কেটের প্রায় কাছাকাছি ভোট পেলেও স্থায়ী সদস্যদের মধ্য থেকে তার পক্ষে সমর্থনের সংখ্যা ছিল একজন কম। এছাড়া আরও চারজন সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এই দৌড়ে সমর্থনের জন্য লড়ছেন, তবে তাদের পক্ষে ভোটের চেয়ে বিরোধিতাসূচক ভোট বেশি পড়েছে, যা তাদের প্রার্থিতার প্রতি আগ্রহ হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।
নতুন প্রার্থীর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, বর্তমান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাসহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই প্রতিযোগিতায় নামার কথা বিবেচনা করছেন। তবে যেকোনো নতুন প্রার্থীকে অল্প সময়ের মধ্যে এই বিভক্ত পরিষদকে রাজি করানোর কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। নতুন প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় নামার বিষয়ে ভোটাভুটির পর জাতিসংঘের নিযুক্ত মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, দেশগুলো যদি আরও প্রার্থী দিতে চায়, তবে তা অবশ্যই তাদের সার্বভৌম অধিকারের মধ্যেই পড়ে।
গ্রিনস্প্যানের সাক্ষাৎকার ও জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ রূপরেখা
গত বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেবেকা গ্রিনস্প্যান বলেছিলেন যে তিনি কোনো ভেটো বা বিরোধিতার মুখোমুখি হলে ‘আশ্চর্য হবেন না’। তার মতে, অতীতে বিজয়ী প্রার্থীরা এ ধরনের বাধা পেরিয়ে এসেছেন, ফলে এটি আলোচনার মাত্র একটি সূচনা। তিনি বলেন, খেলা এখনো শেষ হয়নি—আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
কোস্টারিকান এই অর্থনীতিবিদ আরও মন্তব্য করেন যে জাতিসংঘ বর্তমানে অতিরিক্ত ঝুঁকি এড়াতে চায় এবং এর পরবর্তী নেতাকে কূটনৈতিক ব্যর্থতার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে প্রয়োজনে বারবার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতিসংঘের উচ্চপদগুলো কমানো, আমলাতন্ত্রের লাগাম টেনে ধরা এবং সংস্থাগুলোর কাজের দ্বৈততা রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল ব্যয় সংকোচন করে সংকুচিত সম্পদ ও কমতে থাকা রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াইরত এই প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়।