ক্যান্টনমেন্টে ব্যক্তিগত অস্ত্র বা গানম্যান নেওয়ার বিষয়ে বিধান কী?
ক্যান্টনমেন্টে ব্যক্তিগত অস্ত্র বা গানম্যান নেওয়ার বিষয়ে বিধান কী?
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ
Manual1 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনের একজন প্রার্থীর সাথে ঢাকা সেনানিবাসের একটি প্রবেশপথে দায়িত্বরত মিলিটারি পুলিশ সদস্যদের কথোপকথন ভাইরাল হওয়ার পর সেনানিবাসে প্রবেশের বিধি-বিধান কিংবা নিয়ম-কানুন বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে।
বিশেষ করে বেসামরিক কেউ তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নিজে লাইসেন্স করা অস্ত্র বহন কিংবা সরকার কিংবা সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দেওয়া সশস্ত্র দেহরক্ষী বা গানম্যান নিয়ে সেনানিবাসে প্রবেশ করতে পারেন কি-না সেই আলোচনাও সামনে আসছে ।
একই সাথে অনেকের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে যে- পুলিশ বা অন্য সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা সেনানিবাস এলাকায় নিজেদের অস্ত্র সাথে রেখে সেখানে প্রবেশ করতে পারেন কি-না, কিংবা সেনানিবাসে প্রবেশের সময় তারা অস্ত্র বা গানম্যান ব্যবস্থাপনা কীভাবে করেন।
একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ওই প্রার্থীকে যাদের সঙ্গে তর্কে জড়াতে দেখা যাচ্ছে সেই মিলিটারি পুলিশ কোন প্রক্রিয়ায় সেনানিবাসে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করেন তা নিয়েও অনেকের মধ্যে কৌতূহল দেখা যাচ্ছে।
Manual1 Ad Code
সেনা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেনানিবাসে প্রবেশের ক্ষেত্রে মিলিটারি পুলিশ (এমপি) এর দায়িত্বরত সদস্যের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, এমনকি সেনাকর্মকর্তারাও কেউ যদি তাদের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন বা অমান্য করেন তাহলে তিনিও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হবে না।
তাদের মতে, সেনানিবাসের সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয় ক্যান্টনমেন্ট আইন, ২০১৮ এবং মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরেট এর নির্দেশনার সমন্বয়ের ভিত্তিতে এবং সে অনুযায়ী সেনানিবাস একটি ‘সংরক্ষিত এলাকা’ এবং এর ভেতরে বেসামরিক কোনো ব্যক্তির অস্ত্র বা গানম্যান নেওয়ার সুযোগ নেই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে বেসামরিক মানুষ চলাচল করে, অনেক বেসামরিক লোকজন বসবাসও করে। কিন্তু সেখানে যে কোনো ধরনের আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার বিষয়ে সেনা আইনই চূড়ান্ত। ভূমি বা অন্য কোনো বিষয়ে চাইলে কেউ সুপ্রিম কোর্টে রিট করতে পারে।
Manual6 Ad Code
“আবার সেনাবাহিনী যদি চায়, তারা কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে সামরিক আইনে বিচার করতে পারে; আবার চাইলে ফৌজদারি বিধিতেও সোপর্দ করতে পারে,” বলেন তিনি।
জামায়াত প্রার্থী এস এম খালিদুজ্জামানের ব্যাখ্যা
এমপি প্রার্থীর সাথে কী হয়েছে
ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত দলীয় প্রার্থী এস এম খালিদুজামান মঙ্গলবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতা একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এতে তিনি বলেন, ঘটনাটি প্রায় এক মাস আগের এবং তিনি দাবি করেন যে ইতোমধ্যেই বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে।
‘প্রায় একমাস আগে সেনাবাহিনীর সাথে আমার ঘটে যাওয়া ভুল বুঝাবুঝি প্রসঙ্গে’ শিরোনামে ওইব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “বেশকিছু দিন আগে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গর্ব ও অহংকার, সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী সেনাবাহিনীর দায়িত্বরত সদস্যদের সঙ্গে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম নেয়”।
Manual6 Ad Code
তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি ইতোমধ্যে সমাধান হওয়া সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই সমাধানকৃত ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। যাই হোক উক্ত ঘটনার বিষয়ে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ভুল বুঝাবুঝি আর না হয় সে ব্যাপারে আমি সচেষ্ট থাকবো ইনশাআল্লাহ”।
তবে তিনি কিংবা সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে ঘটনাটি কবে হয়েছিল এবং এর সমাধান কীভাবে হলো সেটি পরিষ্কার করা হয়নি। কিন্তু ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মি. খালিদুজ্জামানের সমর্থকদের অনেককে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, খালিদুজ্জামান মিলিটারি পুলিশের সাথে তর্ক করছেন, কিন্তু মিলিটারি পুলিশ তাকে প্রবেশ করতে অনুমতি দিলেও গানম্যানকে অস্ত্রসহ প্রবেশ করতে অনুমতি দেননি।
এক পর্যায়ে মিলিটারি পুলিশ তাদের পদস্থ কর্মকর্তাকে ফোন দিতে দেখা যায় এবং সেই ফোনে তার সাথে মি. খালিদুজ্জামানকেও কথা বলতে দেখা যায়।
সেখানে এক পর্যায়ে খালিদুজ্জামান বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে নিরাপত্তার জন্য তাকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। তিনি সেনাপ্রধানের কাছেও নালিশ করবেন বলে জানান।
এ সময় তিনি কয়েকবার সেনাসদস্যদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ” ………আপনারা দেশটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং কিছু অফিসার ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে ৫ই অগাস্টের পরে আমাদের দেশটাকে ধ্বংস করছেন”।
তবে বারবার মিলিটারি পুলিশ তাকে বলছিল যে ‘ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ নিষেধ’।
সেনানিবাসগুলোতে ভূমিসহ সব ধরনের ব্যবস্থাপনার জন্য ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড আছে, ছবি প্রতীকী
সেনানিবাসে প্রবেশ সংরক্ষিত; অস্ত্র বিষয়ে নিয়ম কী
সেনা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্টনমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী দেশের সব সেনানিবাস সংরক্ষিত এলাকা এবং ওই আইন অনুযায়ী ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সবকিছু পরিচালিত হয় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে। আর শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো সেনা সদরের অধীনে মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরের নির্দেশনা।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার বলছেন, ক্যান্টনমেন্ট অ্যাক্টে নিরাপত্তা গাইডলাইন দেওয়া আছে এবং ভূমিসহ সেখানকার সবকিছুর ব্যবস্থাপনা ওই অ্যাক্টের আওতায় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড করে থাকে।
“স্টেশন কমান্ডার এর (ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড) গার্ডিয়ান। এছাড়া সরকার কর্তৃক মনোনীত একজন কর্মকর্তা এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে অনেকটা মেয়রের ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া নিরাপত্তা বিষয়ে মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরেট প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
অস্ত্র বা গানম্যান নিয়ে প্রবেশ করা যায় কি-না এবং এ বিষয়ক নিয়ম কানুন কার জন্য প্রযোজ্য এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বেসামরিক যে কারও জন্য নিয়ম হলো অস্ত্র নিয়ে কেউ ঢুকবে না”।
এই নিয়ম কঠোরভাবে প্রতিপালনের উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একুশে নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যেসব মন্ত্রী বা ভিআইপিরা সেনানিবাসে যান তাদের গানম্যানরা সেনানিবাসের গেইটে অবস্থান করেন এবং তাদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না।
পুলিশ ও আনসারসহ সরকারি অন্য যে কোনো সংস্থার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য যে অস্ত্র নিয়ে কেউ ভেতরে প্রবেশ করবে না।
আর সেনানিবাসের ভেতরে অভ্যন্তরীণ বিধি নিষেধ ও সামরিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো মিলিটারি পুলিশের। তারাই সেনানিবাসের অভ্যন্তরে যানবাহন চলাচলের শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সম্পূর্ণ সামরিক চেইন অব কমান্ডের অধীনে কাজ করে।
পুলিশ যদি কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত বা দাপ্তরিক প্রয়োজনে সেনানিবাসে প্রবেশ করতে চায়, তবে আগে থেকে সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়।
Manual1 Ad Code
এসব ক্ষেত্রে অস্ত্র ছাড়াই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে কোনো বিশেষ অভিযানে অস্ত্র বহনের প্রয়োজন হলে সেটি সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয়ের ভিত্তিতে হয়ে থাকতে পারে।
আরেকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলছেন, আর্মি সদর দপ্তরের সার্কুলার বাস্তবায়নে কাজ করে মিলিটারি পুলিশ।
ক্যান্টনমেন্টে বেসামরিক ব্যক্তি ও যানবাহন প্রবেশের বিষয়টিও নিয়ন্ত্রিত
তিনি বলেন, সেনাপ্রধান নিজেও যদি নৌ বাহিনী সদর দপ্তরে যান তাহলে তার সঙ্গে থাকা সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের গেইটে অপেক্ষা করতে হয় এবং সেনাপ্রধান নিজেও অস্ত্র ছাড়া ঢুকবেন সেখানে- এটাই নিয়ম।
“মন্ত্রীরা বা এই পর্যায়ের কেউ ভেতরে গেলে তার সাথে থাকা পুলিশের গাড়ি ও গানম্যান গেইটে অপেক্ষা করবে। যার কাছে অস্ত্র থাকবে তিনি অবশ্যই গেইটে থাকবেন। লাইসেন্সধারী ব্যক্তিগত অস্ত্র নিয়েও কেউ প্রবেশ করতে পারবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তবে কোনো ব্যক্তি যদি সাথে অস্ত্র নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের রাস্তা ব্যবহার করে অন্য দিতে যেতে চান তাহলে তিনি আগেই লগ এরিয়ায় অস্ত্র ও গোলাবারুদের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় অনুমতির জন্য চিঠি দিতে পারেন।
লগ এরিয়া মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ডাইরেক্টরেটের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
“কিন্তু সার্বিকভাবে গানম্যান গেইটে অপেক্ষা করবে। এর কোনো ব্যত্যয় নেই। মিলিটারি পুলিশকে এটি নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত,” বলছিলেন মি. ইসলাম।
“ধরুন রাত ১০টার পর কোনো সেনা কর্মকর্তা বের হচ্ছেন, মিলিটারি পুলিশ সেটি রিপোর্ট করতে পারে। কর্তৃপক্ষ যদি বলে কোনো সামরিক যান আজ বাইরে যাবে না, তাহলে সব অফিসার তা মানতে বাধ্য। মিলিটারি পুলিশ কোনো সামরিক যানকে সেদিন বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেবে না। মনে রাখতে হবে, মিলিটারি পুলিশ সেনা সদরের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।