ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করছে বেইজিং, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক টালমাটাল
ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করছে বেইজিং, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক টালমাটাল
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ০৫:৩৯ অপরাহ্ণ
Manual2 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন করে রূপ দিতে পারে। এই নির্বাচন ঘিরে বেইজিং প্রভাব সুসংহত করতে চাইছে আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক টালমাটাল হয়ে উঠছে।
এবারের এই ভোট ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর দেশের প্রথম নির্বাচন।
প্রত্যর্পণের অনুরোধ সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় ভারতকে নিয়ে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। যে কারণে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততা জোরদার করা হয়েছে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিমপ্রধান এই দেশ শেখ হাসিনার শাসনামলে চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লিই ছিল ঢাকার প্রধান অংশীদার, যে সমীকরণ এখন বদলাচ্ছে।
Manual6 Ad Code
• বেইজিংয়ে ঝুঁকছে ঢাকা?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কার্লান্টজিক বলেন, ‘‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যৎ সরকার প্রকৃত অর্থেই চীনের দিকে ঝুঁকছে।
তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগর সম্পর্কিত চীনের কৌশলগত চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশ এই কৌশলে চীনপন্থী ভূমিকা পালন করবে—এ ব্যাপারে চীন ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসী।’’
ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীনে; যা কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। গত জানুয়ারিতে দুই দেশ ভারতের কাছে প্রস্তাবিত একটি উত্তরাঞ্চলীয় বিমানঘাঁটির কাছে ড্রোন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার একটি অপরিবর্তনীয় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’’
• লাগামহীন বৈরিতা
এর বিপরীতে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে নিয়মিত টানাপোড়েন চলছে। গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে ‘‘সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরাম বৈরিতা’’ চলছে অভিহিত করে এর নিন্দা জানায়।
পুলিশ বলেছে, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ৭০ জন সদস্য নিহত হন। ঢাকা এই সহিংসতার মাত্রা অতিরঞ্জিত করার অভিযোগে ভারতকে দোষারোপ করেছে। তবে সম্পর্ক মেরামতের বিচ্ছিন্ন কিছু প্রচেষ্টাও হয়েছে।
Manual5 Ad Code
জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য ঢাকায় আসেন। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে এগিয়ে আছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপি জিতলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত খালেদা জিয়ার ৬০ বছর বয়সী ছেলে তারেক রহমানের প্রতিও সমবেদনা জানিয়ে বার্তা পাঠান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
কিন্তু ভারতের হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীদের বিক্ষোভের পর এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এর জেরে ভারতে চলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।
• অস্থিতিশীলতা নয়, স্থিতিশীলতায় প্রাধান্য
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রবীণ দোন্থি বলেন, উভয় পক্ষেরই বাস্তববাদী অবস্থানের সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। তিনি বলেন, নয়াদিল্লি ও ঢাকা—দু’পক্ষই সম্পর্কের অবনতির সমাধান না করার মূল্য সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত।
ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছে ঢাকা। এক দশকের বেশি সময় পর জানুয়ারিতে দুই দেশের মাঝে পুনরায় সরাসরি ফ্লাইট চালু করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরকার নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের আর অবনতি না ঘটিয়েই ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারা অব্যাহত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দোন্থি বলেন, নতুন প্রশাসন সম্ভবত অস্থিতিশীলতার চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেবে। তবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে—বিশেষ করে বিএনপি জিতলে, ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল হতে পারে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, একসময় ভারতের সঙ্গে তীব্র বিরোধে থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীও তাদের প্রচারে ‘‘এক ধরনের বাস্তববাদী বাস্তবতা’’ তুলে ধরেছে।
তীব্র বাগাড়ম্বরের পরও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি অটুট রয়েছে। বাণিজ্য স্থিতিশীল আছে এবং শেখ হাসিনা আমলের কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি—ভারতীয় টাগবোট সংক্রান্ত; বাতিল করা হয়েছে।
Manual2 Ad Code
বাংলাদেশে ভারতের সাবেক উপ-হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভারতীয় কূটনীতিক দিলীপ সিনহা বলেন, চীন এমনভাবে অবকাঠামো সরবরাহ করছে; যা ভারত পারে না। তিনি বলেন, কিন্তু ভারত এমন কিছু জিনিস সরবরাহ করে; যা বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন, বিদ্যুৎ এবং পোশাকশিল্পের জন্য সুতা।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়া মানেই ভারতের সঙ্গে বৈরিতা; বিষয়টি এমন নয়। হুমায়ুন কবির বলেন, ‘‘এটি ‘একটি না হলে আরেকটি’ ধরনের পরিস্থিতি নয়। দুই সম্পর্কই একই সঙ্গে বিকশিত হতে পারে।’’