২০২৪ সালের জুলাইয়ের কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এই পুরো সময়জুড়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এখন তারা সরকারের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে ব্যারাকে ফেরার জন্য।
জুলাই আন্দোলনের পর বড় পরিসরে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতির মধ্যে সেনাবাহিনীই কার্যত ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব নেয়। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তারা দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় থাকে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভের মধ্যেই সেনা মোতায়েন করা হয়। সেই আন্দোলনই পরে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনে গড়ায়। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর “নাগরিক সহায়তা (এইড টু সিভিল পাওয়ার)” কাঠামোর আওতায় সেনাবাহিনী মাঠে থেকে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে কাজ করে।
এরপর থেকে সারা দেশেই সক্রিয় ছিল সেনা সদস্যরা। তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে কমানো হয়েছে তাদের উপস্থিতি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রায় ৬৩ জেলার মধ্যে ৫০টি ক্যাম্প থেকে সেনা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন—যা আন্দোলন পরবর্তী সময়ের তুলনায় অনেক কম। তখন ২০০টির বেশি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল।
এই দেড় বছরে সেনাবাহিনী বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করেছে—সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, অপরাধী গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, কিশোর গ্যাং দমন, মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট বসানোসহ নানা কার্যক্রম। পাশাপাশি বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা, আন্দোলন-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি, সাইবার অপপ্রচার মোকাবিলা এবং দুর্যোগে জরুরি সহায়তাও দিয়েছে তারা।
Manual4 Ad Code
সামরিক সূত্র বলছে, এই সময়ের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি অস্ত্র উদ্ধার এবং ২২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজনকে আটক করে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
Manual8 Ad Code
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভোটকেন্দ্র দখল ঠেকানো, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রায় এক লাখ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল।
নির্বাচনের পর ধাপে ধাপে সেনা উপস্থিতি কমানো হয়েছে। এখন মাঠে রয়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য, যারা এখনও বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে সেনা কর্মকর্তাদের ৬০ দিনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যা কয়েক দফায় বাড়ানো হয়। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এই ক্ষমতা আর বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে তারা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ছাড়াই ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে কাজ করছে।
আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) পরিচালক সাইম উল দৌলা চৌধুরী বলছেন, “সরকারের নির্দেশ পেলেই সেনা সদস্যদের প্রত্যাহার করা হবে।”
Manual2 Ad Code
অপরদিকে, গত ১ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদও জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে থাকা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের শিগগিরই প্রত্যাহার করা হবে। তবে নির্দিষ্ট কোনও সময়সীমা তিনি জানাননি।
এর আগে সেনা সদর দফতরের পক্ষ থেকেও একাধিকবার বলা হয়েছিল—নির্বাচন শেষে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরতে চায়। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ১৫ ফেব্রুয়ারি সিএএস দরবারে একই কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরবে, তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কিছু সেনা সদস্য মাঠে থেকে সহায়তা করবে।
Manual7 Ad Code
নির্বাচনের আগে সেনা সদর দফতরের মুখপাত্ররা একাধিকবার জানিয়েছেন, নির্বাচন শেষে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যেতে চায়।
নির্বাচনের পর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সিএএস দরবারে বলেন, নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া এবং পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত কিছু সংখ্যক সেনা সদস্য মাঠে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের—কবে সেনাবাহিনী ফিরবে তাদের স্থায়ী ঠিকানা ব্যারাকে।