আজ বুধবার, ৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেষ বিকেলের ‘শেখ সাহেব

editor
প্রকাশিত মার্চ ৭, ২০২৬, ০৫:২৩ অপরাহ্ণ
শেষ বিকেলের ‘শেখ সাহেব

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

  • ২৩ বছরের বঞ্চনা, রক্ত আর আন্দোলনের ইতিহাস—যে ইতিহাস ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ মাত্র ১৯ মিনিটের এক ভাষণে নতুন মোড় নিয়েছিল। ইত্তেফাকের পাতা থেকে ফিরে দেখা সেই ঐতিহাসিক বিকেল।

২৩ বছরের রক্তাক্ত ইতিহাস। মুমূর্ষু নর-নারীর করুণ আর্তনাদ ও বঞ্চনার ইতিহাস। যে ইতিহাসই দৃপ্তকণ্ঠে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ মাত্র ১৯ মিনিটে উচ্চারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রেসকোর্স ময়দানের সেই বিকেলে শেখ মুজিবুর রহমান কেন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি? ভাষণ শেষে তিনি ‘জয় বাংলা’র সঙ্গে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন কি না—সেসব নিয়ে বিস্তর কুতর্ক হতে পারে। শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনে শেখ মুজিবুর রহমানকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হয়েছে—তা নিয়েও কড়া সমালোচনা চলতে পারে। ১৬ বছর এই ভাষণ শোনাতে শোনাতে কান ঝালাপালা করার বিরক্তিও থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে এই ভাষণ মুছে ফেলা অসম্ভব। মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। ১ মার্চের পর থেকে তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের ডি-ফ্যাক্টো লিডার; যার অধীনে ও নির্দেশনায় বাংলাদেশ পরিচালিত হতো। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ায় সারা বাংলায় যে দুর্বার গণআন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার এক ফলাফল নির্ধারণি ক্ষণ ছিল ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। আসুন একটু দেখে নিই সে সময়ের প্রধান সংবাদপত্র ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর বয়ানে কেমন ছিল সেই ভাষণ। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, শুধু ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ নয়, অন্য আরও কয়েকটি প্রথম সারির সংবাদপত্র তাদের প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘শেখ সাহেব’ নামে আখ্যায়িত করেছে। খুব সম্ভবত ১৯৭১ সালের সেই দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিব ছিলেন—একজন শেখ সাহেব, মুজিব ভাই অথবা বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

‘দৈনিক ইত্তেফাক’ বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্র। শুরুতে আওয়ামী মুসলিম লীগ, পরে আওয়ামী লীগ এবং ১৯৭১ সালের উত্তাল অসহযোগের দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখপত্র ছিল এই সংবাদপত্রটি। ১৯৭১ সালে দৈনিকটির বার্তাকক্ষের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন; যিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মাওলানা আজাদ কলেজ) শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠী ছিলেন। এই পত্রিকাটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তবে মার্চের উত্তাল সেই সময়ে, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশে পত্রিকাটি অতি সতর্কতা অবলম্বন করেছিল।

১৯৭১ সালের ৮ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাক শিরোনাম করে—‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করিতে পারি, যদি—’। সঙ্গে ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। এই প্রধান সংবাদে লেখা হয়েছিল:

‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করিতে পারি, যদি—’ (শিরোনাম) ক. অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করা হয় খ. সমস্ত সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া নেওয়া হয় গ. নিরস্ত্র গণহত্যার তদন্ত করা হয় ঘ. নব-নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়

‘বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল (রবিবার) বিকালে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে সমবেত লক্ষ লক্ষ মুক্তি সেনানীর বজ্রনির্ঘোষ সংগ্রামী ধ্বনির তূর্যনাদের মধ্যে জলদগম্ভীর স্বরে উপরোক্ত ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে শেখ সাহেব বলেন—‘আপনি ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকিয়াছেন। আগে আমার এই সব দাবী মানিতে হইবে—তারপর বিবেচনা করিব, অধিবেশনে যোগ দিব কিনা। এই দাবী পুরণ ছাড়া পরিষদে যাওয়ার অধিকার বাংলার জনগণ আমাকে দেয় নাই।’

Manual3 Ad Code

১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে কর্মরত আবেদ খানের সঙ্গে আলাপে জানতে পেরেছি, এই সমাবেশ কাভারে বেশ কয়েকজন প্রতিবেদক রেসকোর্স ময়দানে ছিলেন। আর সার্বিকভাবে সবকিছু সমন্বয় করেছেন দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন। সে সময় সংবাদপত্রের হেডলাইন আর্টিস্ট দিয়ে আঁকানো হতো। এসব কাজ তদারকি করেছেন সিরাজুদ্দীন হোসেন।

প্রতিবেদনে ফেরত আসা যাক। ‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করিতে পারি, যদি- ‘ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়:

‘বাংলায় সার্বিক মুক্তি আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণাকল্পে ইতিপূর্বেই শেখ সাহেব ৭ই মার্চ রেসকোর্সে ভাষণ দিবেন বলিয়া জানাইয়াছিলেন। সেই অনুযায়ী স্বাধিকারকামী লক্ষ লোক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশলাডের জন্য গতকল্যকার এই সমাবেশে যোগদান করেন। আর শ্লোগানমুখর লাঠিধারী সেই স্বাধিকারকামী জনসমুদ্রকে লক্ষ্য করিয়া শেখ মুজিব শপথদৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, প্রস্তুত হও। এবারের সংগ্রাম বাঙ্গালীর মুক্তির সংগ্রাম। রক্ত দিতে আমি প্রস্তুত। যদি আমি বা আমায় সহকর্মীরা ডাক দিতে নাও পরে—মুক্তি সংগ্রামের পতাকা হাতে তোমরা যাইও।’ তিনি বলেন, ‘ঘরে ঘরে সংগ্রামের দুর্গ গড়িয়া তোল। মুক্তি আসিবেই।’

জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের তারিখ সম্পর্কিত প্রেসিডেন্টের ঘোষণার উল্লেখ প্রসঙ্গে তিনি এ ব্যাপারে সৃষ্ট সঙ্কটের জন্য প্রেসিডেন্ট এবং জনাব ভুট্টোকে দায়ী করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, গোলমালের সৃষ্ট করিলেন ভুট্টো, আর গুলী চলিল বাংলার নিরীহ-নিরস্ত্র জনতার উপর। তিনি বলেন, যখনই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ অর্থাৎ বাংলার মানুষ আত্মপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হইয়াছে, যখনই তাদের হাতে নিজেদের বা সমগ্র পাকিস্তানের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ভার অর্পিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হইয়াছে তখনই তাদের উপর শক্তি লইয়া ঝাপাইয়া পড়া হইয়াছে। কিন্তু কেন? কতকাল এই নির্যাতন চলিবে? তিনি বাংলার মানুষের উপর সামরিক শক্তি প্রয়োগ হইতে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান জানান।

Manual6 Ad Code

এরপর কয়েকটি সাব-হেডে পুরো ভাষণের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সাব-হেডগুলো ছিল—‘বাংলার মানুষ আশা করিয়াছিল’, ‘২৩ বছরের ইতিহাস’, ‘দোষ কি আমাদের’, ‘আর একটি গুলিও চালাইবেন না’, ‘কিসের গোলটেবিল’, ‘গোপন বৈঠকের পর’, ‘রক্তের সাথে বেঈমানি করতে পারি না’, ‘যদি আঘাত আসে’।

প্রধান এই প্রতিবেদনের শেষ অনুচ্ছেদ ‘যদি আঘাত আসে’-তে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়—‘শেখ সাহেব বলেন: যদি আঘাত আসে, যদি আমি নির্দেশ নাও দিতে পারি, যদি আমার সহকর্মীদের পক্ষেও পথনির্দেশ দেওয়া সম্ভব না হয়, বাংলার মানুষ তোমরা নিজেরাই নিজেদের কর্মপন্থা ঠিক করিয়া নিও। হাতের কাছে যা পাও তাই নিয়া শত্রুর মোকাবিলা করিও। রাস্তাঘাট বন্ধ করিয়া দিও—চাকা বন্ধ করিয়া দিও। বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়িয়া মুক্তিসৈনিক হইয়া সর্বশক্তি লইয়া দুশমনের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইও।’

ইহার আগে, সভা শুরু হওয়ার আগে মঞ্চ হইতে সংগ্রামী স্লোগান দান করেন ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শেখ শহীদুল ইসলাম, আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন। শেখ সাহেব মঞ্চে আসিয়া পৌঁছিলে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা জনাব তোফায়েল আহমেদ মঞ্চ হইতে স্লোগান পরিচালনা করেন। আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবাবাহিনী প্রধান জনাব আবদুর রাজ্জাক স্বেচ্ছাসেবকদের কর্মতৎপরতা পরিচালনা করেন। সভার শুরুতে কোরআন পাঠ করেন মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ।

Manual4 Ad Code

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ শুধু ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ই নয়; ‘দৈনিক আজাদ’, ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘সংবাদ’, ‘দ্য পিপল’, ‘দ্য পাকিস্তান অবজারভার’সহ প্রায় সব সংবাদপত্রই বাংলার মুক্তিসংগ্রামের এই মহাসম্মিলনের সংবাদ প্রকাশ করেছিল সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে; যার প্রধান চরিত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

Manual4 Ad Code