১৯৭১ সালের মার্চ মাস। দৈনিক ইত্তেফাক-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক তখন শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন। সম্পাদক হিসেবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ছেলে মইনুল হোসেন দায়িত্বে থাকলেও ওই সময় বার্তাকক্ষের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেনই। সম্পাদনার টেবিলে বসে আকর্ষণীয়, যথাযথ ও কার্যকর শিরোনাম দেওয়ায় বিশেষ মুন্সিয়ানা ছিল সিরাজুদ্দীন হোসেনের। তার দেওয়া অনেক শিরোনামই বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাক-এর পাতায় সিরাজুদ্দীন হোসেন তেমনই এক ঐতিহাসিক শিরোনাম রচনা করেন, ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন’। এটি ছিল মার্চের উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের একদম যথাযথ ও প্রাণবন্ত প্রতিফলন।
সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন। ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে
চলুন, ওই সংবাদটির দিকে একটু নজর দিই। ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর গণমাধ্যমের সামনে অন্তত দু-বার শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু সকলেই জানতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, পাঞ্জাবি অভিজাত শ্রেণি এবং পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে একদম রাজি ছিলেন না। তাই ছয় দফাকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের দলিল’ আখ্যা দিয়ে ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্র গণহত্যার নীলনকশা তৈরি করতে থাকে। ওই ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টোর লারকানার জমিদার বাড়িতে। ইতিহাসে যা ‘হাঁস শিকার ষড়যন্ত্র’ নামে পরিচিত।
Manual8 Ad Code
ইয়াহিয়া-ভুট্টো ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে তৈরি এই নীলনকশার প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যায় ১৯৭১ সালের ১ মার্চ। ওইদিন দুপুরে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এর ফলে ঢাকাসহ সারা দেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। ১ মার্চ দুপুরের পর শুরু হওয়া আন্দোলন ২ মার্চ থেকে সর্বাত্মক ও সর্বগ্রাসী রূপ নেয়। ওই দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে ছাত্র-জনতা। ওই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি ও অভূতপূর্ব ঘটনাবলির খবর প্রকাশিত হয় ৩ মার্চের দৈনিক ইত্তেফাক-এ। আর প্রধান সংবাদের ব্যানার হেডলাইন ছিল ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন’।
Manual4 Ad Code
ঐতিহাসিক ওই সংবাদের সূচনায় লেখা হয়, “আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবর রহমান গতকাল (মঙ্গলবার) এক বিবৃতিতে জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘সুশৃংখল ও শান্তিপূর্ণ-ভাবে হরতাল পালন এবং যাতে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তার প্রতি কড়া নজর রাখার জন্য আমি জনগণের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি। জনগণকে বিশেষ করিয়া ভাড়াটিয়া উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকিতে হইবে।’ জনগণের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘মনে রাখিতে হইবে, যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক, যে ভাষাতেই কথা বলুক, বাংলার প্রতিটি বাসিন্দাই আমাদের দৃষ্টিতে বাঙ্গালী। তাদের জান-মান-ইজ্জত আমাদের কাছে পবিত্র আমানত এবং উহা অবশ্যই রক্ষা করিতে হইবে’।” (সংবাদের খণ্ডাংশ, ৩ মার্চ ১৯৭১, দৈনিক ইত্তেফাক)
এখানে উল্লেখ্য যে, ১ মার্চের পর শেখ মুজিবুর রহমান কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান প্রশাসক (ডি ফ্যাক্টো লিডার) হয়ে ওঠেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোড পরিণত হয় লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের মতো প্রশাসনিক কেন্দ্রে। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শেখ মুজিব সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে। তারই প্রতিফলন দেখা যায় ওই প্রধান সংবাদে।
এবার পরের সংবাদে আসা যাক। বিশেষ কাঠামোর এই শিরোনামের সংবাদে হরতাল পালন ও কারফিউ ভাঙার বিস্তারিত বর্ণনা ছিল। এতে বলা হয়, “জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রতিবাদে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের মহানায়ক আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সংগ্রামী বাংলার রাজধানী ঢাকা নগরী গতকল্য (মঙ্গলবার) প্রচণ্ড গর্জনে ফাটিয়া পড়ে। সর্বাত্মক হরতাল-কবলিত নগরী সারা দিন যেন মিছিল নগরীতে পর্যবসিত থাকে।
দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের গণমানুষের এই নজিরবিহীন সার্বিক হরতালের দরুন রাজধানীতে গতকাল একদিকে চূড়ান্ত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, অপরদিকে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের অবিস্মরণীয় দিনগুলির স্মৃতিকে স্নান করিয়া দিয়া রাজপথে-জনপদে নামিয়া আসে আদিহীন-অন্তহীন জনতার স্রোত। সারাদিন পথে পথে অবাধ পদসঞ্চারে আর রাত্রে সান্ধ্য আইন জারি হওয়ার পর সান্ধ্য আইন লংঘন করিয়া সেই জনসমুদ্র প্রলয়রাত্রের বিক্ষুদ্ধ বঙ্গোপসাগরের উন্মত্ত জল-কল্লোলের মতই প্রমত্ত গর্জনে বার বার গর্জিয়া উঠিতে থাকে। কারফিউর শৃংখলে আবদ্ধ রাত্রির ঢাকায় ঈপ্সিত নৈঃশব্দের স্তব্ধতা ভাঙ্গিয়া, বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা কেবলই গর্জিয়া উঠিতে থাকে সশব্দ গর্জনে জয় বাংলা আর সেই গণকন্ঠের অমোঘ ধ্বনির সঙ্গে একাকার হইয়া বাতাসে বাতাসে ভাসিয়া বেড়াইতে থাকে গুলীবর্ষণের আওয়াজ। গতরাত্রে ঢাকায় কোথায় কি ঘটিয়া গিয়াছে তাহার সঠিক তথ্য জানা না গেলেও শহরের হাসপাতালগুলিতে বুলেটবিদ্ধ লোকের ভিড় ঠিকই জমিতে থাকে। মধ্য রাত্রি পর্যন্ত ঘটনাস্থলে নিহত দুই ব্যক্তির লাশ ও অন্যূন অর্ধ-শতধিক আহত ব্যক্তি হাসপাতালে আনীত হয়। পরে হাসপাতালে আরেকজনের মৃত্যু হয়।
Manual3 Ad Code
মোট কথা, গতকালকের ঢাকা ছিল প্রতিবাদে এককণ্ঠ, প্রতিজ্ঞায় অভিন্ন। দল নাই, মত নাই, পথ ও পেশার পার্থক্য নাই, শেখ মুজিবের ডাকে এক ও অভিন্ন হইয়া সমগ্র ঢাকা গতকাল গণতন্ত্র ও স্বাধিকারের দাবীতে দুর্বিনীত হুঙ্কারে গজিয়া উঠিয়াছে, দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানাইয়া দিয়াছে স্বাধীকারের প্রশ্নে কোন আপোষ নাই।” (সংবাদের খণ্ডাংশ, ৩ মার্চ ১৯৭১, দৈনিক ইত্তেফাক)
১৯৭১-এর ৩ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাক-এর পাতা থেকে।
উপরের বর্ণনাটি ছিল একেবারে যথাযথ। ১৯৭১-এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে সত্যিই কোনো দলীয় বিভেদ ছিল না, ভিন্ন মত ছিল না। স্বাধিকারের প্রশ্নে প্রায় সবাই এক ও অভিন্ন ছিলেন। কিন্তু উত্তাল ওই জোয়ারের মধ্যেও ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। ওই ষড়যন্ত্রের অন্যতম কুশীলব ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। সেদিনের দৈনিক ইত্তেফাক-এর এক সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘ঢাকা আসিতে ভুট্টো আদৌ অনিচ্ছুক নন’। সংবাদটিতে ভুট্টোর ঢাকা আসার খবরকে ইতিবাচকভাবে দেখানো হলেও ভেতরে ভেতরে তার ভিন্ন পরিকল্পনা কারও অজানা ছিল না।
ওই সংবাদে লেখা হয়, “পিপলস্ পার্টির চেয়ারম্যান জনাব জেড. এ. ভুট্টো আজ এখানে [কারাচীতে] বলেন যে, শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আলোচনা অনুষ্ঠানের জন্য পূর্ব পাকিস্তান যাইতে তিনি বরাবরই প্রস্তুত রহিয়াছেন।
আজ এখানে [কারাচীতে] এক সাংবাদিক সম্মেলনে জনাব ভুট্টো বলেন যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার নিশ্চিতভাবে কিছুই হারাইয়া যায় নাই। জনাব ভুট্টো বলেন: পরিষদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয় নাই। দেশের দুইটি প্রধান দল শাসনতান্ত্রিক ব্যাপারে কিছুটা সমঝোতায় পৌঁছা মাত্রই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হইতে পারে। জনাব ভুট্টো প্রকাশ করেন যে, আগামীকাল করাচীতে পিপলস পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হইবে।” (সংবাদের খণ্ডাংশ, ৩ মার্চ ১৯৭১, দৈনিক ইত্তেফাক)
এছাড়া অন্যান্য সংবাদেও ছিল মার্চের উত্তাল আন্দোলনের খবর। ছিল নৈরাজ্যকারীদের নিয়ে সতর্কতাও। ১৯৭১-এর মার্চের প্রতিটি দিনের সংবাদপত্রই ছিল দুর্বার অসহযোগ আন্দোলন ও প্রাণ বিসর্জনের আখ্যান। তবে তার মধ্যে ৩ মার্চের দৈনিক ইত্তেফাক ছিল বিশেষ ব্যতিক্রম। এর মাধ্যমে বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার শহর-নগর-বন্দরে।