আজ মঙ্গলবার, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনী প্রচার শুরুর আট দিনে ৪২ নির্বাচনী সহিংসতা

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ৩০, ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
নির্বাচনী প্রচার শুরুর আট দিনে ৪২ নির্বাচনী সহিংসতা

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনাও তত বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাল্টাপাল্টি হামলা ও সংঘর্ষে ভোটের পরিবেশে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এসব সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীর মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, গণভোট ঘিরে পরিবেশ কতটা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন থাকবে– এমন প্রশ্নও সামনে আসছে। নির্বাচনী জনসভায় একে অন্যের প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়ছেন। ভোটের মাঠের কথার লড়াই কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আট দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি। এতে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩৫৩ জন। ১ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ৬৫টি। এতে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৫৫৫ জন।

Manual6 Ad Code

সর্বশেষ গত বুধবার শেরপুরে প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবর্দী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হন।

তপশিল অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীদের প্রচারণা শুরু হয়। ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত প্রচারণা চালানো যাবে।

গতকাল রাতে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, ভোট সম্পন্ন করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এরপর যদি দু-চারটি ঘটনা ঘটে, তা নির্বাচনের জন্য বড় বাধা নয়। আমাদের যা যা করণীয়, তা নিচ্ছি। বাংলাদেশে সব নির্বাচনে কম-বেশি সংঘর্ষ হয়ে থাকে।

মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির সমকালকে বলেন, নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের প্রচার কার্যক্রমে যে রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগের কারণ। গত আট দিনে দেশে অন্তত ৪২টি সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু ও সাড়ে তিনশর বেশি মানুষের আহত হওয়া স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় নির্বাচনী পরিবেশ এখনও নিরাপদ ও সহনশীল হয়ে ওঠেনি। নিহতদের একজন নারী। যিনি নিজে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থেকেও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরোনো দুঃখজনক চিত্র।

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আরও বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা জরুরি। শেরপুরের ঝিনাইগাতীর ঘটনাটি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, জনমনে অস্বস্তি তত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও বড় ভূমিকা নেওয়ার বিষয় আছে। দলীয় নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। নেতাকর্মীকে সংযত থাকা ও ধৈর্যের বার্তা দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে নির্বাচন হলো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া রক্তাক্ত হলে, বিতর্কিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্র।

তপশিল ঘোষণার পর ২০০ সহিংসতা

পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী তপশিল ঘোষণার পর ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে ২০০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ৯টি, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ৭৩টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ২টি, হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন ৮টি, প্রচারকাজে বাধা ২২টি, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অফিস, প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ১৪টি, আক্রমণাত্মক আচরণ ১৫টি, রাজনৈতিক হত্যা ৪টি, সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ ১টি, অবরোধ-বিক্ষোভ ১১টি এবং অন্যান্য কারণে সহিংসতার ঘটনা ৪২টি।

রাজনৈতিক সহিংসতা

আসক বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে। এটি ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও সহিংসতর হয়ে উঠেছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং চার হাজার ৭৪৪ জন আহত হয়েছেন।

আসকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অন্তত ৩৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৫৪ জন আহত এবং নিহত হয়েছেন ১০ জন; বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৫২০ জন আহত এবং তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে চারটি সহিংস সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক আহত হয়েছেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ১৯২টি সংঘর্ষে অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে দুই হাজার ৩৮০ জন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে সারাদেশে দুর্বৃত্তদের হামলা, নির্যাতন ও গুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ১১১ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

Manual4 Ad Code

হত্যার ঘটনা

বুধবার বিকেলে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত। সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। তিনি ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক ছিলেন।

গত ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় নির্বাচনী প্রচারণা ঘিরে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নজরুল ইসলাম নামে এক কর্মী নিহত হন। তিনি ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক ছিলেন।

Manual8 Ad Code

গত ২১ জানুয়ারি নাটোরের সিংড়ার কুমারপাড়া গ্রামে জিয়া পরিষদের সদস্য মো. রেজাউল করিমকে (৫২) গলা কেটে হত্যার জেরে আব্দুল ওহাব নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ লোকজন। এ ঘটনায় ঘরের ভেতর থাকা ছাবিহা বেগম (৭২) নাম এক নারী দগ্ধ হয়ে মারা যান। এর আগে একই গ্রামে গলা কেটে হত্যা করা হয় জিয়া পরিষদের সদস্য মো. রেজাউল করিমকে। রেজাউল করিম বিলহালতি ত্রিমোহনী ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন।

কেরানীগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ৪৩ ঘণ্টা পর ২৪ জানুয়ারি বিএনপি নেতা হাসান মোল্লা (৪২) মারা যান। হাসান মোল্লা কেরানীগঞ্জ মডেল থানার হযরতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। হযরতপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ের সামনে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করে দুর্বৃত্তরা।

গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন থানাধীন বক্সকালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পরে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

হামলা-সংঘর্ষ

পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, তপশিল ঘোষণার পর সারাদেশে ২০০ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘাত হয়। আবার কোথাও বিএনপি জোটের প্রার্থী ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা হামলা ও পাল্টা হামলায় জড়ায়।

গত ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে জনসভায় চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ভাতশালা গ্রামে বিএনপিপ্রার্থী মো. ফজলুর রহমানের নির্বাচনী জনসভার শেষ পর্যায়ে কাস্তুল ইউনিয়ন যুবদলের একটি মিছিল নিয়ে এই ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩০ নেতাকর্মী আহত হন।

Manual2 Ad Code

এ ছাড়া ২৪ জানুয়ারি মেহেরপুরের গহরপুর গ্রামে নারী কর্মীদের হেনস্তার প্রতিবাদ করায় তিনজনকে মারধর করার অভিযোগ করেছে জামায়াত।

১৯ জানুয়ারি এ জেলার চৌদ্দগ্রাম থানা এলাকার সমেশপুর এবং তেলিপুকুর এলাকায় স্থানীয় জামায়াতের অফিস ও সমর্থকের বাড়িতে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে এ ঘটনা নিয়ে শুভপুর ও মুন্সীরহাট বাজারে বিএনপি এবং জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

গত ২৬ জানুয়ারি পটুয়াখালীর দশমিনার পাগলা বাজারে সোমবার রাতে বিএনপি জোটের প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের কর্মীদের সংঘর্ষে সাতজন আহত হন। একই দিন সিরাজগঞ্জ-২ (সদর ও কামারখন্দ) আসনে বিএনপি ও জামায়াতের দুটি মিছিল মুখোমুখি হলে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হন।

নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবীরের কর্মীকে মারধর ও নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি প্রার্থীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

 

তথ্য সুএঃ সমকাল