রমজানের রেকর্ড পণ্য আমদানিতেও শঙ্কা খালাসে দীর্ঘসূত্রতায় অস্থিরতা বাজারে
রমজানের রেকর্ড পণ্য আমদানিতেও শঙ্কা খালাসে দীর্ঘসূত্রতায় অস্থিরতা বাজারে
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬, ০৭:০৩ অপরাহ্ণ
Manual2 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
আসন্ন পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বাড়ানো হলেও বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। বাণিজ্য উপদেষ্টার দাবি অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৪০ শতাংশ। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা ও লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে শতাধিক জাহাজ আটকা পড়েছে। ফলে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও পাইকারি বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের দামে।
চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রমজান মাসে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় তিন লাখ টন। গত বছরের নভেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এক লাখ আট হাজার টন সয়াবিন তেল এবং দুই লাখ ৫৮ হাজার টন পাম অয়েলসহ মোট তিন লাখ ৬৬ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল মোট তিন লাখ ৭২ হাজার টন। তবে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত বছরের তুলনায় এবার আমদানি ৫৬ হাজার টন কম হয়েছে।
Manual2 Ad Code
এর মধ্যে সরকার ঘাটতি মেটাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কানাডা থেকে ১৬৩.০৬ টাকা লিটার দরে দুই কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার লিটার সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সয়াবিন ও পাম অয়েল মিলিয়ে মোট তিন লাখ ৯২ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র (এলসি) খুলেছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল চার লাখ ৫১ হাজার টন।
ভোজ্যতেলের মতো মটর ডালের আমদানিও কম হয়েছে। গত নভেম্বর থেকে চলতি জানুয়ারির ১৫ তারিখ পর্যন্ত মটর ডাল আমদানি হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার টন, যা গতবারের একই সময়ের তুলনায় এক লাখ ৬৮ হাজার টন কম।
Manual8 Ad Code
গতবার দুই লাখ ৮১ হাজার টন আমদানি হয়েছিল। এবার ৫৯.৭৯ শতাংশ কম আমদানি হয়েছে।
রোজায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে ছোলার। রোজায় চাহিদা থাকে প্রায় এক লাখ টন। গত নভেম্বর থেকে চলতি জানুয়ারির ১৫ তারিখ পর্যন্ত রোজা সামনে রেখে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার টন।
চাহিদার চেয়ে ৭২ হাজার টন বেশি আমদানি হয়েছে। এবার আমদানি বেশি হয়েছে। এ ছাড়া আরো ছোলা বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ ছাড়া গত নভেম্বর থেকে চলতি জানুয়ারির ১৫ তারিখ পর্যন্ত এক লাখ ৪৬ হাজার টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক লাখ টন বেশি। গত বছর আমদানি হয়েছিল ৪৬ হাজার টন। গত বছরের তুলনায় এবার মসুর ডাল আমদানি বেড়েছে প্রায় ২১৭.৩৯ শতাংশ। মাঝারি ও ছোট দানার মসুর ডালের দাম এক বছরের ব্যবধানে দেশের বাজারে বেড়েছে। তবে মোটা দানার মসুর ডালের দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় ৩০.৯২ শতাংশ এবং ভারতে ৯.০৯ শতাংশ হারে মসুর ডালের দাম কমেছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা মূলত এই দুটি দেশ থেকেই মসুর ডাল আমদানি করে থাকেন। তাই এই পণ্যটির দাম কম থাকতে পারে বলে আশা করেছেন ব্যবসায়ীরা।
রোজায় চিনির চাহিদা প্রায় তিন লাখ টন বলে ধারণা করা হয়। রোজা সামনে রেখে গত অক্টোবরের ১৫ থেকে চলতি ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চিনি আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ টন। গত বছরের তুলনায় আমদানি বেড়েছে দুই লাখ ২৭ হাজার টন। গতবার আমদানি ছিল দুই লাখ ৭৩ হাজার টন। ৮৩.১৫ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে। গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত চিনির দাম ৫ শতাংশ বেড়েছে।
ইফতারে খেজুর একটি অপরিহার্য খাদ্যপণ্য। রমজান মাসে বাংলাদেশের বাজারে খেজুরের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। রোজায় খেজুরের চাহিদা ৬০ হাজার টন। গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির ১৫ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে। পাইপলাইনে রয়েছে আরো ৪৬ হাজার টন। গত এক মাসে দেশের বাজারে আমদানিনির্ভর এই পণ্যের দাম ২.৬৭ শতাংশ কমে মানভেদে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানির এই রেকর্ড কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে ভোজ্যতেল, ডাল, চিনিসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যবাহী শতাধিক জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় ভাসছে। খালাসপ্রক্রিয়ায় এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাজারে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত এক সপ্তাহে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ছোলার দাম পাঁচ টাকা বেড়ে কেজি ৭৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি মণ চিনি তিন হাজার ৫০০ টাকা এবং পাম অয়েল পাঁচ হাজার ৯৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত এবং বেচাকেনা ভালো রয়েছে। তবে মাঝখানে দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় এখন কিছুটা বাড়ছে বলে দাবি এই ব্যবসায়ী নেতার।
Manual2 Ad Code
এদিকে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের কারণে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নির্বাচনের সময় যান চলাচল বন্ধ থাকলে বন্দরে আটকে থাকা পণ্য বাজারে পৌঁছতে আরো দেরি হতে পারে।
গত ২৬ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনাবিষয়ক টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, দেশে রমজানের পণ্যের কোনো সরবরাহ সংকট নেই, বরং আমদানি গত বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি হয়েছে। এ কারণে রমজানের পণ্যের দাম গত বছরের চেয়ে কম থাকবে। তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণগত বিশ্লেষণ করে জেনেছি, গত বছরের চেয়ে এ বছরের রমজানের বাজার আরো বেশি স্থিতিশীল থাকবে।’
তবে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসায়ীদের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের ভোক্তারা তার সুফল পান না। সরকারের বাজার মনিটরিংও দুর্বল। যেখানে মনিটরিং হয়, সেখানেও অনেক সময় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ব্যবসায়ীরা ডলারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখালেও বাস্তবে এর প্রভাব খুব বেশি নয়, কারণ ডলারের দাম বেশ কিছুদিন ধরে স্থিতিশীল রয়েছে। ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকার পরও দাম বাড়ানো অযৌক্তিক।