ভক্তি আন্দোলনের প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু-এর শুভ আবির্ভাব তিথি ও গৌরপূর্ণিমা মহোৎসব উপলক্ষে শুরু হয়েছে ২৪তম সংকীর্তন পদযাত্রা।
গত১৪ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এ ধর্মীয় পরিক্রমা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করবে।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, শ্রী শচীমাতা স্মৃতিতীর্থ ধাম থেকে যাত্রা শুরু হয়ে বাহুবল, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, রাজনগর, ফেঞ্চুগঞ্জ, মুঘলাবাজার, পূর্ণখোলা, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও তাহেরপুর হয়ে পবিত্র পণতীর্থ ধাম পর্যন্ত পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। পথে পথে নগর সংকীর্তন, হরিনাম প্রচার, ভজন-কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজন থাকবে।
পদযাত্রার অংশ হিসেবে ভক্তরা ঢাকা দক্ষিণ মহাপ্রভুর বাড়ি, শ্রীবাস ঠাকুরের বাড়ি, অদ্বৈত প্রভুর আবির্ভাব স্থান, মাধবেন্দ্র প্রভুপাদের আবির্ভাব স্থানসহ বিভিন্ন পবিত্র লীলাক্ষেত্র পরিদর্শন করবেন। এছাড়া শ্রীমঙ্গলের শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের আখড়া ও মৌলভীবাজারের নিতাই-গৌর মন্দিরে বিশেষ অবস্থান কর্মসূচি পালিত হবে।
Manual1 Ad Code
আয়োজকরা বলেন, দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম তীর্থ পরিক্রমা করেছেন, কলিযুগে নিত্যানন্দ প্রভু এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও গয়া পরিক্রমার মাধ্যমে তীর্থমাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের দেখানো পথ অনুসরণ করেই আজও ভক্তরা পরম্পরা ধারায় তীর্থযাত্রায় অংশগ্রহণ করছেন।
আয়োজক কমিটির বক্তব্যে বলা হয়, “তীর্থের উদ্দেশ্যে এক কদম এগোলেই সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়—এমন মাহাত্ম্য শাস্ত্রে বর্ণিত আছে। মন্দির যেকোনো স্থানে নির্মাণ করা গেলেও ধাম বা তীর্থস্থান স্বয়ং ভগবানের লীলাক্ষেত্র হওয়ায় তা অনন্য পবিত্র। ধাম পরিক্রমা মানুষের পারমার্থিক উন্নতি ও সুকৃতির উদয় ঘটায়।”
শ্রীপাদ সবেশ্বর গোবিন্দ দাস ব্রহ্মচারী, অধ্যক্ষ, শ্রী শ্রী শচীমাতা স্মৃতি আনন্দ ধাম বলেন, “এই পরিক্রমা কেবল একটি পদযাত্রা নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও ভক্তি জাগরণের মহাযজ্ঞ। যুগে যুগে মুনি-ঋষি ও আচার্যরা তীর্থ পরিক্রমার মাধ্যমে মানবসমাজকে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ দেখিয়েছেন। আমরা সেই চিরন্তন পরম্পরা রক্ষা করতেই এই আয়োজন করেছি।”
Manual4 Ad Code
গৌড়ীয় বৈষ্ণব আচার্য ও জয়পতাকা স্বামী মহারাজ বিভিন্ন বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, “ধাম পরিক্রমা মানে কেবল ভৌগোলিক ভ্রমণ নয়; এটি হৃদয়ের পরিশুদ্ধি ও চেতনার জাগরণ। যখন ভক্তরা একত্রে হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে ধাম পরিভ্রমণ করেন, তখন ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয়ভাবেই কল্যাণ সাধিত হয়।” তাঁর ভাষায়, কলিযুগে হরিনাম ও ধাম-সেবা হচ্ছে আত্মোদ্ধারের সর্বশ্রেষ্ঠ পথ।
এছাড়া আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (International Society for Krishna Consciousness)–এর প্রতিষ্ঠাতা আচার্য অভয় চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ তাঁর গ্রন্থসমূহে বারবার উল্লেখ করেছেন যে, “পবিত্র ধাম ভ্রমণ ও হরিনাম কীর্তন মানুষের চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে এবং ভক্তিকে দৃঢ় করে।” আয়োজকরা জানান, এই শিক্ষাকেই সামনে রেখে এবারের পদযাত্রা আরও ব্যাপকভাবে আয়োজন করা হয়েছে।
ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করা, ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করা এবং সমাজে শান্তি ও মানবকল্যাণের বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এ মহতী উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
আয়োজকরা সকল ধর্মপ্রাণ ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের এই পবিত্র পদযাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আজ ভক্তদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, সর্বত্র ভগবানের গুণকীর্তন করতে করতে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরিক্রমা এগিয়ে চলছে। বর্তমানে ভক্তবৃন্দ বিয়ানীবাজার শিবাসঅঙ্গন অতিক্রম করে গোলাপগঞ্জ ঢাকা দক্ষিণে মহাপ্রভুর বাড়ি, শ্রীবাস ঠাকুরের বাড়ি, সুনামগঞ্জ-এ অদ্বৈত প্রভুর আবির্ভাব স্থান এবং মাধবেন্দ্র প্রভুপাদের আবির্ভাবস্থলসহ বিভিন্ন লীলাক্ষেত্র পরিদর্শন করছেন। এসব পবিত্র তীর্থে স্থানীয় অসংখ্য ভক্ত পরিক্রমায় অংশ নিয়ে নামসংকীর্তনে এক অপূর্ব ভক্তিময় আবহ সৃষ্টি করেছেন।
আগামীকাল সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট হয়ে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলা বনগাঁও শচীমাতার বাড়িতে মহাপ্রভুর কৃপাধন্য এই পরিক্রমার শুভ সমাপনী অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান সরকারের প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় সমগ্র আয়োজন সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।
পরিশেষে, পরম করুণাময় শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর চরণকমলে প্রার্থনা—এই নামসংকীর্তনের অমৃতধারা যেন সকলের হৃদয়ে প্রেমভক্তির দীপ জ্বালিয়ে দেয়। ভক্তসমাজের এই ঐক্য, ভজনানন্দ ও তীর্থপরিক্রমা হোক আত্মশুদ্ধি ও চৈতন্যচেতনার নব জাগরণ।
“হরি নাম সংকীর্তনেই কলিযুগের একমাত্র পাথেয়”—এই বিশ্বাসে ভক্তবৃন্দ এগিয়ে চলেছেন, প্রেম ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন সর্বত্র।