গ্যাস সংকটের অবনতির সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস, বন্ধ অনেক শিল্পকারখানা
গ্যাস সংকটের অবনতির সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস, বন্ধ অনেক শিল্পকারখানা
editor
প্রকাশিত আগস্ট ১৪, ২০২৬, ০৪:০০ অপরাহ্ণ
Manual5 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানো গ্যাস সংকট গতকাল বৃহস্পতিবার আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এদিন বিকেল ৫টার দিকে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির এই অবনতি ঘটে।
জাতীয় গ্রিডে এখন প্রয়োজনীয় এলএনজি সরবরাহের মাত্র চার ভাগের এক ভাগ পাওয়া যাচ্ছে।
সাগরে আবহাওয়া খারাপ থাকায় সোমবার থেকে অপেক্ষায় থাকা একটি এলএনজি ট্যাংকার ভাসমান টার্মিনালে (এফএসআরইউ) ভিড়তে পারেনি। এ কারণে ওই টার্মিনাল থেকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, নতুন করে এই সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।
এর ফলে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মোট গ্যাস সরবরাহ কমে ১ হাজার ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।
গত বুধবার ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল।
এই সংকটের কারণে বড় বড় শিল্প এলাকাগুলোতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা বন্ধ রেখেছে। সিএনজিচালিত গাড়ি চলাচল ও রান্নার কাজে চরম ভোগান্তি হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক কমে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৩০টিই যানবাহনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহের দাবিতে গতকাল জামালপুরে মহাসড়ক অবরোধ করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরা।
গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় বেশ কয়েকটি জেলার বাসিন্দারা রান্নাবান্না করতে হিমশিম খাচ্ছেন। গ্যাসের এই চরম সংকট এখন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, এমনকি ঢাকাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) কর্মকর্তাদের মতে, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গতকাল মধ্যরাত থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব গ্রামাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় দিনে আট থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) যেখানে ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেখানে তারা পাচ্ছেন মাত্র ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট।
দেশে বর্তমানে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
Manual4 Ad Code
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথমার্ধে প্রতি ঘণ্টায় গড় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ উচ্চ পর্যায়ে ছিল।
তবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের হাতে বর্তমানে তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির মালিকানাধীন ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৌশলীদের মাধ্যমে এটি সচল করার অপেক্ষা করা ছাড়া আর তেমন কিছু করার নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামতে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের কথা উল্লেখ করে টুকু বলেন, ‘দিন গোনা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছি না।’
সরকার বর্তমান গ্যাস সরবরাহ কাজে লাগিয়ে লোডশেডিং সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা এবং শিল্পকারখানাগুলোতে যথাসম্ভব গ্যাস দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে সরকার চাইলেই অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে পারছে না, আবার ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি দিয়ে এলএনজিও আমদানি করতে পারছে না।
গতকাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার আর কী-ই বা করার আছে?’
সামিট পরিচালিত এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার আগেই তিনি এ মন্তব্য করেন।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল নরসিংদীকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিল্প প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদী ও মাধবদীর প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল, ডাইং এবং প্রিন্টিং কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এই শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) মুখপাত্র এবং আবেদ টেক্সটাইল প্রসেসিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কারখানা মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের মজুরি, ইউটিলিটি বিল এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করেন।
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু বলেন, ‘আমাদের পোশাক, টেক্সটাইল এবং ডাইং শিল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়ছে। মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং এখন এই সংকটে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে।’
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মামুনুর রহমান জানান, জেলায় চাহিদার মাত্র অর্ধেক গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, কারখানা এবং বাসাবাড়ির গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে সেখানে দেওয়া হচ্ছে।’
নারায়ণগঞ্জ এলাকায় গত তিন দিন যাবত অনেক কারখানায় কার্যত কোনো গ্যাস সরবরাহ ছিল না।
দেশের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম তাদের ১০টি প্রধান কারখানার সবকটিই বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত ১০ আগস্ট রাত থেকে তাদের গ্রুপের ৫৭টি কারখানার সবগুলোই বন্ধ রাখা হয়েছে।
কিছু কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে বাড়তি জ্বালানি খরচ মিটিয়ে এখনো চালু রাখা হয়েছে।
এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ ৩৯০ শতাংশ বেড়েছে।
Manual2 Ad Code
তিনি বলেন, ‘টেক্সটাইল মিলের মতো এপেক্সের কারখানাগুলোতে এত বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হয় না, তাই এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।’
লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মঞ্জুর বলেন, ‘আমাদের মতো ছোট কারখানায় যদি ৩৯০ শতাংশ খরচ বাড়ে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা সহজেই বোঝা যায়।’
জ্বালানির এই বাড়তি ব্যবহার কেবল উৎপাদন খরচই বাড়াচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ভরযোগ্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও সংকটে ফেলছে।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ বা গ্যাস কখন থাকবে না তা যদি আগে থেকে জানা যেত, তবে ব্যবসায়ীরা তাদের উৎপাদনের সময়সূচি সে অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে পারতেন।
‘যদি আমরা জানি যে মাঝরাত থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত জ্বালানি সংকট থাকবে, তবে আমরা উৎপাদনের সময় বদলে নিতে পারি। কিন্তু সরকারকে আমাদের সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।’
Manual3 Ad Code
তিনি আরও যোগ করেন, বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকেরা আগামী মৌসুমগুলোতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা কমতে শুরু করেছে।
পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্নোটেক্স গ্রুপের পরিচালক শরিফুন রেবা জানান, লোডশেডিং এবং ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে সম্প্রতি তাদের জ্বালানি খরচ ১৫০ শতাংশ বেড়েছে।
জ্বালানি সংকট দেশের অন্যতম প্রধান চাল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোতেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
কুষ্টিয়ার খাজানগরে দেশের বৃহত্তম সরু চালের পাইকারি বাজারে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন মিলগুলো দিনে মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মিল মালিকেরা।
স্বর্ণা অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সামাদ বলেন, তার মিলে সাধারণত দিনে প্রায় ৯০ টন চাল উৎপাদন হতো। এখন ডিজেল পুড়িয়েও উৎপাদন ৩০ টনের বেশি হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চালের মানও খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
Manual8 Ad Code
সারা দেশের বাসাবাড়িতে দিনের অনেকটা সময় রান্না করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
[নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, জামালপুর ও কুষ্টিয়া জেলার সংবাদদাতারা এই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন]