আজ বৃহস্পতিবার, ২৭শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৯ হাজার স্কুলছাত্রীর পড়ালেখার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত !

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৬:৩৫ অপরাহ্ণ
৯ হাজার স্কুলছাত্রীর পড়ালেখার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত !

Manual8 Ad Code

তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:

প্রায় শতবছর ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে চা শ্রমিকদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা। মফস্বল এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় বাগানের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি থাকলেও নেই শিক্ষার পরিবেশ। এতে করে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চা বাগানের শিশুরা।

দেখা যায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় ঘনবসতি এলাকা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্বে সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত সুনছড়া (দেবল ছড়া) চা বাগান। এ বাগানে প্রায় ৩ হাজার মানুষের বসবাস। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে টিলার ওপর সুনছড়া চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় বলতে একটি ভাঙ্গা টিনশেডের ঘর। এই ঘরটিও হেলে পড়েছে। ঘরের মধ্যে গাদাগাদি করে বসে চা শ্রমিকের বাচ্চারা ক্লাস করছে। বাচ্চাদের নেই স্কুলের নির্দিষ্ট পোশাক ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। অনেকের পরনের জামাটাও ছেঁড়া। একই ঘরে বাঁশের বেড়া দিয়ে দুটি শ্রেণিকক্ষ করা হয়েছে। এছাড়া জায়গা না থাকায় পাশেই বাগানের হেড ক্লার্কের বাংলোর বারান্দায় ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।

Manual1 Ad Code

শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য কয়েকটি ভাঙা বেঞ্চ আর একটি ছোট ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কিছুই নেই। শিক্ষকদের বসার জন্যও নেই পর্যাপ্ত চেয়ার। ক্লাসে কাঠের একটি টুল ও একটি ভাঙা টেবিল। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা ১৯৪০ সালে হলেও কাগজপত্রে প্রতিষ্ঠা সাল লেখা ১৯৮০।

Manual3 Ad Code

এভাবেই চলছে মৌলভীবাজার জেলার ৬৯টি চা বাগানের বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী থাকলেও নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শিক্ষা উপকরণ, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশনসহ অন্যান্য কিছুই। নামে বিদ্যালয় থাকলেও কাজে কিছুই নেই। বাগান মালিকপক্ষ শুধু বিদ্যালয় নামটা বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও এসব বিদ্যালয় সরকারি করার চিন্তা করেনি সরকার। চা বাগান শ্রমিকদের সন্তানদেরকে শতবছর ধরে শিক্ষার সুযোগ থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

বিভিন্ন তথ্য সূত্র অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি গড়ে ৫০-৬০ শতাংশ। শিক্ষা ব্যবস্থার দুরাবস্থার কারণে প্রাথমিকে ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পরলেও মাধ্যমিকে এসে ৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ঝরে পড়ে। জীবনের শুরুতে চা বাগানের শিশুদের পড়ালেখায় প্রচুর আগ্রহ থাকলেও অভাব আর সুযোগ সুবিধার অভাবে অনেকেই প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারে না।

অভিভাবকরা বলেন, ‘আমরা সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এখন আমাদের সন্তানেরাও বঞ্চিত হচ্ছে। যেখানে আমরা নিজেরাই নুন আনতে পান্তা ফুরাচ্ছে, সেখানে কীভাবে বাচ্চাদের জন্য টাকা খরচ করবো। প্রতিটি বাগানে সরকারি স্কুল নির্মাণ করে উপবৃত্তি চালু করা হোক।’

চা বাগানের শিক্ষার্থীরা জানায়, স্কুলে পড়ালেখার পরিবেশ নেই। আমাদের শিক্ষকেরাও কষ্ট করে পড়ান। ভাঙা ঘর ছাড়া কিছুই নেই স্কুলে। আমাদের স্কুল ড্রেস নেই। ঠিকমতো খাতা কলম কিনতে পারি না। খেলাধুলার সামগ্রীও নেই।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রের বরাতে জানা যায়, জেলার ৯২টি চা বাগানে ৬৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। এই বিদ্যালয়গুলো সংশ্লিষ্ট বাগান থেকে পরিচালনা করা হয়। কিছু বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শুধুমাত্র বই দেওয়া হয়।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান পরিবর্তনের জন্য একটাই উপায়, শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবেশ মানসম্মত করা। যতদিন শিক্ষার মান উন্নয়ন হবে না, ততদিন তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। চা শ্রমিকের অনেক সন্তান আছে যারা কষ্ট করে পড়ালেখা করে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র‌্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে, ভালো অবস্থানে চাকরি করছে। আবার অনেকেই পড়ালেখা করছে। তাদের সবাইকে এক হয়ে বাগানের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে।

কমলগঞ্জ উপজেলার সুনছড়া চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক মিটুন কুর্মী বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী আছে। তবে শিক্ষক মাত্র ৩ জন। একজন চা শ্রমিক যে পরিমাণ মজুরি পান, একজন শিক্ষক সেই একই পরিমাণ সম্মানী পান। আবার অনেক শিক্ষকের সম্মানী সারা মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা মাত্র। আমাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। অনেক কষ্ট করে বাচ্চাদের ক্লাস করাতে হচ্ছে।

Manual1 Ad Code

মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সফিউল আলম বলেন, চা বাগানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারীকরণ সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কেউ যদি লেগে থাকে তাহলে একসময় হয়ে যাবে। চা বাগানের স্কুলগুলো সরকারি করার সুযোগ আছে। সবাই চেষ্টা করলে পর্যায়ক্রমে সরকারি করা সম্ভব।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, আমরা সবসময় চা বাগানের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্গতি নিয়ে বলে আসছি। কিন্তু কেউ বলা কথা গুলো শুনার কেউ নেই।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, চা বাগানের স্কুলের করুণ পরিণতি নিয়ে বারবার স্মারকলিপি দিয়েছি, আন্দোলন করেছি। তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। চা বাগানের শিশুগুলো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় হচ্ছে। দ্রুত সময়ে বাগানের স্কুলগুলো সরকারি করণের দাবি জানান তিনি।

চা শ্রমিকদের জীবন নিয়ে পিএইচডি করা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আশরাফুল করিম বলেন, চা বাগানে ১৯৭৭ সালের আইন অনুযায়ী প্রতিটি বাগানে একটি করে স্কুল থাকার কথা। তবে তা খাতা কলমেই সীমাবদ্ধ বাস্তবে রূপ নেই। আর যে কয়টা বিদ্যালয় আছে সেখানেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। প্রতিটি চা বাগানে অন্তত একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা দরকার। চা শ্রমিকেরা তো স্বাধীন দেশের নাগরিক। সরকারকে শুধু শিক্ষা নয়, তাদের স্বাস্থ্য ও খাদ্য বাসস্থান মৌলিক চাহিদাগুলো মাঝে মজুরির দিকে নজর রাখতে হবে। বাগানে যেভাবে যোগযোগ ধরে বৈষম্যের শিকার তা শতাধিক বছর পর ও এভাবে চলে আসছে। এই বৈষম্য দূর করা বর্তমান সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এই সরকার এখন পর্যন্ত চা বাগানের দিকে নজর দিয়েছেন এমনটা লক্ষ্যণীয় কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

Manual1 Ad Code

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, বিষয়টি আমি শুনলাম। সুনির্দিষ্টভাবে চা বাগানের কোনো বিদ্যালয় থেকে আবেদন করলে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হবে।