আজ শুক্রবার, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিএনএনের বিশ্লেষণ: ক্ষমতা পরিবর্তন করা জেন-জি ভোটের দৌড়ে কোথায় পিছিয়ে পড়ল?

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৫:৩৮ অপরাহ্ণ
সিএনএনের বিশ্লেষণ: ক্ষমতা পরিবর্তন করা জেন-জি ভোটের দৌড়ে কোথায় পিছিয়ে পড়ল?

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

তরুণ প্রজন্ম বা জেন জি–র নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থানে এক স্বৈরশাসকের ক্ষমতাচ্যুতির পর আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারী) প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছে বাংলাদেশ। কোটি কোটি তরুণ যে আন্দোলনকে নতুন বাংলাদেশের পথচলা হিসেবে কল্পনা করেছিল, এই নির্বাচন তারই ধারাবাহিকতা।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির নেতৃত্বে থাকা শেখ হাসিনাকে হেলিকপ্টারে করে দেশ ছাড়তে দেখা যায়। তখন বিক্ষোভকারীরা তাঁর সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ে। দৃশ্যটা সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলে। এই আন্দোলন থেকেই অনুপ্রাণিত হয় দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া আরও অনেক আন্দোলন। নেপাল ও মাদাগাস্কারে এর প্রভাব পড়ে, যেখানে সরকার পতনের আন্দোলন জোরদার হয়।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান হওয়ায় অনেকেই খুশি। শেখ হাসিনার প্রধামন্ত্রীত্বের সেই সময়টা নিন্দা কুড়িয়েছে জাল নির্বাচনের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, আর বিরোধীদের কঠোর দমন-পীড়নের জন্য। হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক ছাত্র মির্জা শাকিল সিএনএনকে বলেন, ‘এই বিপ্লব দেখিয়েছে, জেন জি চাইলে কত বড় কিছু করতে পারে।’

তবে বাস্তবতা হলো — হাসিনার পরবর্তী বাংলাদেশকে যাঁরা নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে, তাঁরা কেউই প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও রাজপথে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে নামানোর আন্দোলনে নেমে যাওয়া সেই তরুণদের দলের নন।

বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে যাওয়া দুই সম্ভাব্য নেতার একজন ৬০ বছর বয়সী। তিনি এমন এক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি, যারা দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। অন্যজন ৬৭ বছর বয়সী একজন ইসলামপন্থী নেতা, যার দল এবারের নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি।

Manual3 Ad Code

আরেক সাবেক আন্দোলনকারী সাদমান মুজতবা রাফিদ রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে লিঙ্গ, জাতি বা ধর্ম নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে। আমরা নীতিগত পরিবর্তন আর সংস্কার আশা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার অনেক ফারাক রয়ে গেছে।’

Manual6 Ad Code

গুরুত্বপূর্ণ এক ভোট

শেখ হাসিনার পতনের শুরু হয় সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। এর জবাবে সরকার কঠোর ও রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন চালায়। কিন্তু এতে আন্দোলন থেমে যায়নি, বরং আরও তীব্র হয়। আরও বেশি মানুষ রাজপথে নেমে আসে।

খুব দ্রুত আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সেনাবাহিনী জানায়, তারা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাবে না। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় — হাসিনার শাসনের দিন শেষ।

Manual2 Ad Code

২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীরা তাঁর সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ে। দেয়াল ভাঙে, ভেতরের জিনিসপত্র লুট হয়। পরিস্থিতি এমন হয় যে শেখ হাসিনাকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গিয়ে নির্বাসনে থাকতে হয়।

গত বছরের নভেম্বরে ঢাকার একটি আদালত এই অস্থিরতায় তাঁর ভূমিকার জন্য শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে, ওই সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষ মারা গেছেন।

Manual6 Ad Code

এখন শেখ হাসিনা দুই দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনে এক ধরনের চাপের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশ তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায়। আর হাসিনা দাবি করেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি।

তাঁর দল আওয়ামী লীগকে আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এই অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি সুবিধা করে দিয়েছে দলটির ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে।

বিএনপির নেতা তারেক রহমান — যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার ছেলে — ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরেছেন। এখন তিনিই নির্বাচনে জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার বলে মনে করা হচ্ছে।

পুরোনো রাজনীতির আরেক শক্তি জামায়াতে ইসলামীও আবার সক্রিয় হচ্ছে। হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘদিন দমনের মুখে থাকা এই ইসলামপন্থী দলটি এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের গড়া নতুন দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) দেশের বিভক্ত ও সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজের জায়গা তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছে।

ডিসেম্বরের শেষ দিকে এনসিপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের ঘোষণা দেয়, তখন অনেকেই বিস্মিত হন। লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক নাওমি হোসেন সিএনএনকে বলেন, ‘এই জোটের পেছনে নিরাপত্তার বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে এনসিপির কিছু নেতা সংসদে যাওয়ার ভালো সুযোগ পাবেন।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশে সংসদ সদস্য হওয়া মানে একধরনের সুরক্ষা। সেই সুরক্ষা না থাকলে নেতারা প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকিতে থাকেন।

সম্প্রতি প্রার্থী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর একের পর এক সহিংস হামলা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই অস্থিরতা ছাত্র আন্দোলনকারীদের প্রাথমিক আশার সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রী নাজিফা জান্নাত বলেন, ‘এনসিপি সংস্কার, অন্তর্ভুক্তি আর অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু যে দল একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি, তাদের সঙ্গে জোট করা আমাদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার মতো।’ তিনি একে ‘লজ্জাজনক ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেন।

তবু বৃহস্পতিবারের ভোটকে অনেকে গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম সত্যিকারের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলে মনে করছেন। ঢাকার রাস্তায় মানুষের মধ্যে এখন অপেক্ষা আর উত্তেজনার মিশ্র অনুভূতি। সাবেক আন্দোলনকারী শাকিল সিএনএনকে বলেন, ‘এই নির্বাচন নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারে। আমরা রোমাঞ্চিত।‘