ইরানের ওপর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে দেশটির সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছে, তবে এখনো অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। একই সঙ্গে তেহরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থে আঘাত হানতে সক্ষম — বুধবার এমনটাই বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড।
Manual6 Ad Code
গ্যাবার্ড বলেন, ‘ইরানের সরকার এখনো টিকে আছে, তবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র কারণে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।’ আরও বলেন, ‘তবুও ইরান ও তাদের মিত্ররা এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের স্বার্থে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে এবং তা চালিয়েও যাচ্ছে। যদি এই শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তাহলে তারা কয়েক বছর ধরে আবার তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বাহিনী পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।’
এই শুনানি ছিল গ্যাবার্ডের কয়েক মাসের মধ্যে প্রথম বড় জনসমক্ষে উপস্থিতি।
এই শুনানিতে মূলত ইরান যুদ্ধ নিয়েই আলোচনা হয়, যা এখন তৃতীয় সপ্তাহে চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজ দলের কিছু রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট — উভয় পক্ষের আইনপ্রণেতারাই এই যুদ্ধ নিয়ে আরও তথ্য জানতে চেয়েছেন। এই বিমান হামলায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, কোটি মানুষের জীবন ব্যাহত হয়েছে এবং জ্বালানি ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন এই সংঘাত নিয়ে কংগ্রেসকে যথেষ্ট তথ্য দিচ্ছে না। গত দুই সপ্তাহে গোপন বৈঠক হলেও তারা প্রকাশ্য শুনানির দাবি জানিয়েছেন।
Manual1 Ad Code
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট সিনেটর মাইকেল বেনেট বলেন, ‘এভাবে পুরোপুরি অন্ধকারে রাখার ব্যাপারটা নিয়ে সবারই কথা বলা উচিত।’ তিনি সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পর এ কথা বলেন। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল — ইরানের হুমকি কীভাবে মোকাবিলা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধ ঘিরে প্রথম বড় পদত্যাগ
গ্যাবার্ড, র্যাটক্লিফ, এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলসহ অন্যান্য গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এই শুনানিতে মঙ্গলবারের একটি বড় ঘোষণাও আলোচনায় আসে। গ্যাবার্ডের এক শীর্ষ সহকারী যুদ্ধের কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের প্রধান জো কেন্ট এই যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পদত্যাগ করেন। এই কেন্দ্রটি জাতীয় গোয়েন্দা দপ্তরের অধীনে এবং কেন্ট গ্যাবার্ডের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক চিঠিতে কেন্ট লেখেন, ‘আমি বিবেকের স্বচ্ছতার দিক থেকে এই ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারছি না। ইরান আমাদের দেশের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল না। এটা স্পষ্ট যে, ইসরায়েল ও তাদের শক্তিশালী লবির চাপেই আমরা এই যুদ্ধে জড়িয়েছি।’
Manual4 Ad Code
তবে শুনানিতে র্যাটক্লিফ কেন্টের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ইরান দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি এবং এই সময়েও তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল।’
গ্যাবার্ডের দেওয়া হুমকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বলেছিলেন, ইরান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে — যা হামলার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে শুনানির আগে প্রকাশিত লিখিত বক্তব্যে গ্যাবার্ড বলেন, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এরপর থেকে তা পুনর্গঠনের কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি।
কিন্তু সিনেটরদের সামনে তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, জুলাই মাসে ইরান তাদের অবকাঠামোর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পকে কী জানানো হয়েছিল
এই কমিটির চেয়ারম্যান ও আরকানসাসের রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন তাঁর বক্তব্যে ট্রাম্পের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ইরানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পদক্ষেপ বিশ্বকে আরও নিরাপদ করেছে।
অন্যদিকে, ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার প্রশাসনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে কংগ্রেসকে যথাযথভাবে ব্রিফ করা হয়নি। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, গ্যাবার্ড যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে তদন্তে মনোযোগ দিচ্ছেন, অথচ ইরান পর্যবেক্ষণের মতো কাজে জনবল কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী তথ্য পেয়েছিলেন — তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পকে সতর্ক করা হয়েছিল যে ইরানে হামলা হলে পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর পাল্টা আঘাত আসতে পারে। অথচ সোমবার ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরানের প্রতিক্রিয়া তাকে বিস্মিত করেছে।
প্রশাসনের আরও কিছু দাবিরও গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক সমর্থন নেই। যেমন, ইরান শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে বা দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে পারমাণবিক বোমা বানাতে পারবে — এমন দাবির পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ নেই বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া অভিযানের আগে ট্রাম্পকে জানানো হয়েছিল, হামলা হলে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে। এটি তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ। এ বিষয়ে ট্রাম্পকে ব্রিফ করেছিলেন কি না – এ প্রশ্নে মন্তব্য করতে চাননি গ্যাবার্ড। তিনি শুধু বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সর্বোত্তম নিরপেক্ষ তথ্য দিচ্ছে।’তথ্য সুএঃ ইনডিপেনডেন্ট