সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত, সব কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত, সব কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত
editor
প্রকাশিত মে ১৯, ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ণ
Manual5 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে গঠিত স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শক্রমেই সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই বিলুপ্তির পর সদ্য গঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবসহ মোট ১৫ জন কর্মকর্তাকে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়েছে।
Manual8 Ad Code
মঙ্গলবার (১৯ মে) আইন ও বিচার বিভাগ থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। উল্লেখ্য, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক ও স্বাধীন সচিবালয় গঠনের উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ জারি করা হলেও বর্তমান বিএনপি সরকার তা আর চূড়ান্ত আইনে পরিণত করেনি।
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ২২ অনুচ্ছেদে ‘নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। তবে সংবিধানের এই ঘোষণার পর দীর্ঘ ২০ বছর পার হলেও এটি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে তৎকালীন বিচারক মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ জন বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা করা হয়।
Manual4 Ad Code
এই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট জুডিশিয়াল সার্ভিসকে একটি স্বতন্ত্র সার্ভিস হিসেবে ঘোষণা করার ঐতিহাসিক আদেশ দেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। মাসদার হোসেন মামলার ওই রায়ে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল—সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে, বিচার বিভাগ সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকবে না এবং নিম্ন আদালতের বার্ষিক বাজেট সুপ্রিম কোর্ট নিজেই প্রণয়ন ও বরাদ্দ করবে, যেখানে নির্বাহী বিভাগের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।
Manual6 Ad Code
আপিল বিভাগের সেই ঐতিহাসিক রায়ের প্রায় আট বছর পর, ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কাগজে-কলমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সেই ঘোষণা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ১০ আগস্ট দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। ২১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেনে দেওয়া এক অভিভাষণে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মাসদার হোসেন মামলার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের ১১৬ক অনুচ্ছেদে বিচারকদের স্বাধীনতার কথা বলা হলেও আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের যৌথ এখতিয়ার বা দীর্ঘদিনের ‘দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা’ সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না।
প্রধান বিচারপতির এই অনড় অবস্থানের পর, ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর পৃথক সচিবালয়ের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। একই সময়ে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য জোরালো সুপারিশ পেশ করে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছিল, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগকে অর্থবহভাবে স্বাধীন করতে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।
সব আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছিল। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই অধ্যাদেশটিকে আর আইনে রূপান্তর না করে আজ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়টিই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।