যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অবশেষে সেই অবধারিত ঘটনাই ঘটল। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা, দলের অভ্যন্তরীণ প্রবল চাপ এবং দেশজুড়ে কমতে থাকা জনপ্রিয়তার মুখে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।
তার এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে লেবার পার্টির নেতৃত্বে এবং দেশের শাসনভারে এক বড় ধরনের পালাবদলের পথ প্রশস্ত হলো। আর এই দৌড়ে ডাউনিং স্ট্রিটের পরবর্তী বাসিন্দা হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম, যাকে এখন ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রায় নিশ্চিত ধরে নেওয়া হচ্ছে।
Manual6 Ad Code
স্টারমারের এই বিদায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই তার সরকারের প্রতি জনসমর্থনে ধস নামতে শুরু করে। নির্বাচনী প্রচারণায় এড়িয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকটগুলো সামনে এনে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যখন কর বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের মতো অজনপ্রিয় নীতি গ্রহণ করে, তখন থেকেই ভোটাররা ক্ষুব্ধ হতে শুরু করেন।
তবে তার সরকারের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। জেফরি এপস্টেইনের বিতর্কিত বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে আমেরিকায় ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে গোটা দেশে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে, যেখানে লেবার পার্টি এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ফলস্বরূপ, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং-সহ দলের প্রায় ১০০ জন এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগের দাবি তোলেন।
Manual1 Ad Code
স্টারমারের পদত্যাগের ফলে এখন লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। প্রেডিকশন মার্কেট বা বেটিং বাজারগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্ডি বার্নহামের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা এখন রেকর্ড ৯৫ শতাংশ। লেবার পার্টির ‘কিং অব দ্য নর্থ’ খ্যাত বার্নহাম সম্প্রতি তার রাজনৈতিক সক্ষমতার এক বিশাল প্রমাণ দিয়েছেন।
গত ১৮ জুন মেকারফিল্ড উপ-নির্বাচনে তিনি এক দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে আনেন। স্থানীয় নির্বাচনে এই আসনটিতে ডানপন্থী পপুলিস্ট দল ‘রিফর্ম ইউকে’ একচেটিয়া জয় পেলেও, উপ-নির্বাচনে বার্নহাম ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তাদের সহজেই পরাজিত করেন। এই জয়ের মাধ্যমেই তিনি পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন এবং দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি যোগ্যতা অর্জন করেন।
নেতৃত্ব নির্বাচনের এই লড়াইয়ে বার্নহামের পাশাপাশি ওয়েস স্ট্রিটিং বা সাবেক সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী আল কার্নসের মতো নেতারাও মাঠে নামতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, স্ট্রিটিংয়ের জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ৩ শতাংশ। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন নেতা হতে হলে প্রার্থীদের লেবার পার্টির ৪০৩ জন এমপির মধ্যে অন্তত ৮১ জনের সমর্থন নিশ্চিত করে মনোনয়ন পেতে হবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে দলের সাধারণ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সদস্যদের সরাসরি ভোটে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ বলছে, সাধারণ দলের সদস্যদের মাঝে বার্নহাম বিপুল ব্যবধানে জনপ্রিয় এবং তিনি অনায়াসেই এই নির্বাচনে জয়লাভ করবেন।
তবে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের চাবি হাতে পেলেও অ্যান্ডি বার্নহামের সামনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হবে না। ইউগভের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মে থেকে জুনের মধ্যে সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের কাছে বার্নহামের প্রতি অনীহার হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা তার জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
Manual4 Ad Code
একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরে স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাঙ্গা করার কঠিন কাজ তার কাঁধে পড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে—বিশেষ করে একজন খামখেয়ালি আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে ব্রিটেনের কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার মতো অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিও তাকে অত্যন্ত সাবধানে সামলাতে হবে। দেশ পরিচালনার এই নতুন অধ্যায়ে বার্নহাম কতটুকু সফল হবেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা যুক্তরাজ্য।