দেনমোহর পরিশোধ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের রায়; স্ত্রীকে আদালতে যেতে বাধ্য করলে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারবে আদালত
দেনমোহর পরিশোধ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের রায়; স্ত্রীকে আদালতে যেতে বাধ্য করলে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারবে আদালত
editor
প্রকাশিত অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০২:৩৭ অপরাহ্ণ
Manual8 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া নিকাহনামায় ‘বিলম্বিত দেনমোহর’ চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নাই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, স্ত্রী দাবি করা মাত্রই তা তত্ক্ষণাত্ প্রদেয় দেনমোহর হিসেবে গণ্য করতে হবে। যা অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য হবে। ‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ সংক্রান্ত মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে বিচারপতি মো. আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ে বলা হয়েছে, স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু দেনমোহর পরিশোধ করছে না। এজন্য স্ত্রীকে আদালতে যেতে বাধ্য করা হলে পারিবারিক আদালত বিবেচনাধিকার প্রয়োগ করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিতে পারবেন। সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এ রায় প্রকাশ করা হয়।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে ইয়াকুব আলীর সঙ্গে বিবাহ হয় সানজিদা নাসরিনের। পরে তাদের কোল জুড়ে আসে এক কন্যা সন্তান। যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে ২০১৭ সালে স্ত্রীকে তালাক দেন ইয়াকুব। তালাক কার্যকর হওয়ার পর ২০১৯ সালে বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন খোরপোশ এবং কন্যা সন্তানের খোরপোশ দাবি করে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন স্ত্রী।
Manual4 Ad Code
মামলায় ২০২২ সালের ২৫ মে স্ত্রীর পক্ষে রায় ও ডিক্রি প্রদান করে আদালত। যেখানে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন খোরপোশ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং কন্যা সন্তানের খোরপোশ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা দুই মাসের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া কন্যা সন্তানের বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে (বার্ষিক ১০ শতাংশ বৃদ্ধিসহ) খোরপোশের আদেশ দেওয়া হয়।
Manual6 Ad Code
একতরফা রায়ের বিরুদ্ধে পরের বছর আপিল করেন ইয়াকুব। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজ স্বামীর আপিল খারিজ করে পারিবারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে দেওয়ানি রিভিশন দায়ের করা হয় হাইকোর্টে। উচ্চ আদালতে রিভিশন আবেদনের শুনানিতে ইয়াকুবের কৌসুলি বলেন, রায়ের ডিক্রির অর্থের একটি বড় অংশ পরিশোধ করেছেন স্বামী। ব্যাবসায়িক আর্থিক ক্ষতির কারণে অবশিষ্ট টাকা এককালীন পরিশোধ করা সম্ভব নয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বকেয়া দেনমোহর ও খোরপোশ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া উচিত। স্ত্রীর পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, স্বামী সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী ও কন্যা সন্তানের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। তথ্যপ্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে পারিবারিক আদালত যুক্তিযুক্ত রায় ও ডিক্রি দিয়েছে। রিভিশন আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। এতে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের সুযোগ নাই। উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করে অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখে উচ্চ আদালত।
Manual6 Ad Code
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, দেনমোহরের কোনো অংশ মওকুফ বা মাফ করার এক্তিয়ার আদালতের নেই। তবে স্ত্রী চাইলে স্বেচ্ছায় স্বামীর অনুকূলে তার দেনমোহরের পুরো অংশ বা কিছু অংশ মাফ বা পরিত্যাগ করতে পারেন। এ ধরনের মাফ বা ত্যাগের বিষয়টি নির্ভর করবে স্ত্রী সচেতনভাবে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেটা করেবেন কিনা। বলপ্রয়োগ, অনুচিত, প্রভাব, প্রবঞ্চনা বা মুক্ত সম্মতিকে ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো বিষয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথাকথিত মওকুফকে বৈধ মাফ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, আলোচ্য মামলায় ধার্যকৃত দেনমোহর বর ও কনের আর্থিক সামর্থ্য বা সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী ধার্য করা হয়নি। তাই লিখিত দেওয়ানি চুক্তির শর্তাবলির বিরুদ্ধে যাওয়ার কেনো সুযোগ কারও নাই। বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় স্কুলগামী একজন নাবালিকা সন্তানের ভরণপোষণের ক্ষেত্রে ধার্যকৃত খোরপোষ যথাযথ। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রুলটি খারিজ করে অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখা হলো।