দিল্লিতে আবারও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেতারা, বাজানো হল শেখ হাসিনার অডিও বার্তা
দিল্লিতে আবারও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেতারা, বাজানো হল শেখ হাসিনার অডিও বার্তা
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০১:৪৮ অপরাহ্ণ
Manual7 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
ভারতের দিল্লিতে এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা।
দিল্লির সাংবাদিকদের সঙ্গে শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের এই কথোপকথনের আয়োজন করেছিল ‘ফরেন করেস্পডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া’ বা এফসিসি।
‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’, অর্থাৎ ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র বাঁচাও’ শীর্ষক ওই সেমিনারে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি রেকর্ড করা অডিও ভাষণ শোনানো হয়।
ওই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছে, যার অন্যতম হলো জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ করে বিগত বছরের ঘটনাবলির ‘নিরপেক্ষ তদন্তের’ দাবি, যাতে, তাদের ভাষায়, ‘খাঁটি সত্যটা’ জানা যায়।
এছাড়াও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মব সন্ত্রাসের সংস্কৃতি, সংখ্যালঘু এবং বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী আর সাংবাদিকদের ওপরে আক্রমণ ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয় “বিশ্বের নজরে” আনার জন্য।
অনুষ্ঠানটিতে বাংলাদেশের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সশরীরে হাজির ছিলেন আর ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগ দিয়েছিলেন আরেক প্রাক্তন মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক আগে পর পর দুই সপ্তাহে ভারতের রাজধানী শহরে আওয়ামী লীগ নেতাদের দুটি সংবাদ সম্মেলনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসাবে দেখা হচ্ছে।
যদিও গত বছর দেড়েকে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এমনকি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিবিসি সহ অনেক ভারতীয় গণমাধ্যমকে ইমেলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
আবার ভার্চুয়াল মাধ্যমেই শেখ হাসিনা নিয়মিত তার দলের নেতা-কর্মীদের আলোচনা সভাগুলিতে যোগ দেন। কিন্তু সবই শুধু অডিও মাধ্যমে – ভিডিওতে নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন যে বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে সেদেশের মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের বক্তব্য পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্যই ভারতের মাটিতে এভাবে একের পর এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করছে দলটি।
সেমিনারে শেখ হাসিনার রেকর্ড করা অডিও বার্তা শোনানো হচ্ছে
Manual8 Ad Code
ফরেন করেস্পডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া’ কয়েকদিন ধরেই প্রচার করেছিল শুক্রবার সন্ধ্যার এই সেমিনারের বিষয়ে। ভারতের গণমাধ্যমের একাংশে এরকম প্রচারও ছিল যে শেখ হাসিনা এই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল মাধ্যমে হাজির থাকবেন।
তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি বিবিসি।
অবশেষে জানা যায় যে একটি রেকর্ড করা অডিও বার্তা পাঠাবেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানটি লাইভ সম্প্রচারের যে লিংক দেওয়া হয়েছিল, সেটিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ভারত, বাংলাদেশ আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
ভারতীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেই লিংকে বহু মানুষ অপেক্ষা করছিলেন। তারা কমেন্ট করছিলেন যে দেড় বছর পরে তারা শেখ হাসিনাকে ‘একবার দেখার আশায় রয়েছেন’।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পরেই হাজার হাজার মানুষ ওই লাইভ সম্প্রচারে যুক্ত হতে থাকেন। মিনিট কুড়ির মধ্যেই ইউটিউবে দেখা যায় ১৩৮০৯ জন অনুষ্ঠানটি দেখছেন, ৩৩ মিনিটে ৫৪ হাজার আর ভারতীয় সময় ছয়টা চল্লিশ মিনিটে দর্শক সংখ্যা ছিল ৯২৫২৫।
এক পর্যায়ে দর্শক সংখ্যা এক লক্ষ ছাপিয়ে যায়।
Manual2 Ad Code
সেই সময়েই বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রেকর্ড করা অডিও ক্লিপ বাজানো হচ্ছিল অনুষ্ঠানে।
তবে তার অডিও ক্লিপ বাজানোর পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে যে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের, তখন দর্শক সংখ্যা নেমে এসেছিল আড়াই হাজারের কাছাকাছি।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু এবং নারীদের নিরাপত্তার জন্য গ্যারান্টি দাবি করা হয় দিল্লির ওই অনুষ্ঠান থেকে – প্রতীকী ছবি
কী ঘোষণা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের?
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দুই প্রাক্তন মন্ত্রী সহ সশরীরে এবং ভার্চুয়াল মাধ্যমে দলটির যেসব নেতা-নেত্রী সেমিনারে হাজির ছিলেন, তারা সকলেই প্রায় একই ধরনের বক্তব্য রাখেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত দেড় বছরে মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বাংলাদেশে মব সংস্কৃতি, সেদেশের সংখ্যালঘু মানুষদের ওপরে নির্যাতন, দলীয় কর্মীদের হত্যা, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে রেফারেণ্ডারেম আয়োজনের আইনি বৈধতা ইত্যাদি বহুল চর্চিত বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়।
এর মধ্যেই পাঁচ দফা দাবি তোলা হয়, যেটিকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ‘আশু কর্তব্য’ বলে উল্লেখ করেন।
এই দাবিগুলির মধ্যে একটি হলো, “জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ জানানো হোক, যাতে তারা প্রকৃত অর্থে বিগত বছরের ঘটনাবলি সম্পর্কে নতুন করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করবে। আমরা খাঁটি সত্যটা জানতে চাই যাতে স্বার্থপরের মতো প্রতিশোধস্পৃহাকে প্রত্যাখ্যান করে দেশবাসী হিসাবে শোধরানো যায়, ক্ষতে প্রলেপ পড়ে।”
Manual4 Ad Code
এছাড়াও তারা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অপসারণের দাবি তোলা হয়। প্রতিনিয়ত রাস্তাঘাটে যে সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তা বন্ধ করার আবেদন করা হয়।
সংখ্যালঘু এবং নারীদের নিরাপত্তার জন্য গ্যারান্টি দাবি করা হয় ওই অনুষ্ঠান থেকে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সাংবাদিক, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা এবং জেলে পাঠানো বন্ধের দাবি তোলা হয়।
গত সপ্তাহে দিল্লির প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়াতে সংবাদ সম্মেলন
বারবার কেন সংবাদ সম্মেলন দিল্লিতে?
গত সপ্তাহেও দিল্লির প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়াতে একটি সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দুজন প্রাক্তন মন্ত্রী। সেদিন সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল হাজির হয়েছিলেন ওই অনুষ্ঠানে।
সেটিই ছিল ২০২৪-এর পাঁচই অগাস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রথম সংবাদ সম্মেলন।
দিল্লিতে ১৭ই জানুয়ারি যে সংবাদ সম্মেলন হয়, সেটির আয়োজক ছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা আইসিএফআর নামে একটি সংগঠন ও লন্ডনভিত্তিক একটি ল-ফার্ম।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় বা ওএইচসিএইচআর জুলাই-অগাস্টের বিক্ষোভ নিয়ে যে প্রতিবেদন করেছিল, তার একটি জবাবি প্রতিবেদন তৈরি করেছে আইসিএফআর নামে সংগঠনটি।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের গণমাধ্যমই সব থেকে উপযুক্ত, তাই দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করা হচ্ছে।
Manual3 Ad Code
বিশ্লেষকরা বলছেন যে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরাখবর বাংলাদেশের বহু মানুষ পড়ে থাকেন, তাই দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করলে সেই খবর বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে যাবে সহজেই।
নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য এটা তাদের একটি রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।