আজ শুক্রবার, ১৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা পদে ‘রেড নোটিশে’ থাকা মোহসেন রেজায়ি, কেন শঙ্কায় ইসরায়েল

editor
প্রকাশিত আগস্ট ১১, ২০২৬, ০৬:০৪ অপরাহ্ণ
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা পদে ‘রেড নোটিশে’ থাকা মোহসেন রেজায়ি, কেন শঙ্কায় ইসরায়েল

Manual1 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির দপ্তর দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে নতুন নিয়োগ দিয়েছে। এর মধ্যে সাবেক ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান মোহসেন রেজায়িকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব ও সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি করা হয়েছে। তার এই নিয়োগকে ঘিরে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে।

Manual4 Ad Code

মোহসেন রেজায়ি দীর্ঘ ১৬ বছর আইআরজিসির প্রধান ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও তিনি বাহিনীটির কমান্ডার-ইন-চিফের দায়িত্ব পালন করেন। গত রোববার তাকে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান করা হয়।

এর এক দিন পর ইরানের সামরিক বাহিনীর আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইরানের ‘যৌথ যুদ্ধ কমান্ড’-এর প্রধান আলী আবদুল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন চিফ অব স্টাফ করা হয়েছে। আলী ওজমাইকে দেওয়া হয়েছে আইআরজিসির নৌবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব। কট্টরপন্থী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদিকেও আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাকে ‘মেজর জেনারেল পদমর্যাদায়’ এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মোহাম্মাদ পাকপুরের স্থলাভিষিক্ত হলেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় পাকপুর নিহত হন।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব নিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের অবস্থান নরম হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি বলেন, ‘এ বিষয়ে খুব কমই সন্দেহ আছে যে খামেনি, ভাহিদি এবং আইআরজিসির নেতৃত্ব সবাই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয়।’

রেজায়ির দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি আইআরজিসির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সংগঠনটির সাধারণ সদস্যদের মধ্যেও প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত।

Manual3 Ad Code

আজোদি আরও বলেন, ‘তার এ নিয়োগের উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সংহতি আরও জোরাল করা, সংগঠনটির ওপর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করা এবং এমন এক অভিজ্ঞ ব্যক্তির দক্ষতা কাজে লাগানো, যিনি আইআরজিসিকে আজকের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।’

রেজায়ি আগে এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সেক্রেটারি ছিলেন। এটি রাষ্ট্রের আরেকটি শীর্ষ সালিসি সংস্থা। ১৯৮০-এর দশকের ইরাক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে বেশি মনোযোগ দেন। ওই দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধী রেজায়ি

৭১ বছর বয়সী রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইব্রাহিম রাইসির প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে তাকে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কখনো নির্বাচিত কোনো পদে দায়িত্ব পালন করেননি। রেজায়ি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও সফল হতে পারেননি।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে সামরিক পোশাকে আবারও সামনে আসেন রেজায়ি। মোজতবা খামেনি তার নিহত বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর রেজায়িকে সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা করা হয়।

এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার ও অনলাইনে দেওয়া পোস্টে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার বার্তা দিয়ে আসছেন রেজায়ি।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের করা একটি সমঝোতা স্মারকেরও (এমওইউ) তিনি বিরোধিতা করেন। ওই সমঝোতার আওতায় সাময়িকভাবে ইরানের নৌ অবরোধ ও তেলবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

রেজায়ির বক্তব্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তন না করলে ইরান কঠোর অবস্থান নেবে। তিনি হরমুজ প্রণালি নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গত সপ্তাহে রেজায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তার আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। না হলে দেশটির সেনাদের গুরুতর ঝুঁকি ও প্রাণহানির মুখে পড়তে হবে। তিনি বলেন, ‘ইরান কখনোই হরমুজ প্রণালিতে দ্বিতীয় কোনো করিডোর খোলার অনুমতি দেবে না।’

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কয়েক দিন ধরেই স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়ে আসছিল, রেজায়ি শিগগিরই দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা পদে আসতে পারেন। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এ নিয়োগে আপত্তি জানাচ্ছিলেন। এর অংশ হিসেবে তিনি প্রথমে তৎকালীন নিরাপত্তাপ্রধান মোহাম্মাদ বাঘের জোলঘাদরের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।


ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ডসের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজায়ি

কেন রেজায়িকে বেছে নেওয়া হলো
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, রেজায়ির নিয়োগ ইরানের যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের ‘কৌশলগত পুনর্গঠন’ শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নীতির বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তবে সম্পাদকীয়তে জোলঘাদরকে ব্যর্থতা বা অসন্তোষের কারণে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা নাকচ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, সরকার রেজায়ির নিয়োগের বিরোধিতা করেছিল, এমন দাবিও ঠিক নয়।

সম্পাদকীয়র ভাষ্য, রেজায়ি সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নীতির মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় করতে পারবেন। এর ফলে ‘আলাদাভাবে কাজ করার প্রবণতা’ বা সমন্বয়হীনতার সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

নুরনিউজ বলেছে, ‘মূল বিষয় একজন সেক্রেটারির (প্রধান) বিদায় বা আরেকজনের আগমন নয়। বরং এ নতুন পর্যায়ে (পরিবর্তিত ব্যবস্থাপনায়) নিরাপত্তা পর্ষদ সচিবালয় যে পদক্ষেপগুলো নেবে, সেগুলোর প্রভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ বা ফলপ্রসূ হবে, সেটিই প্রকৃত বিষয়।’

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বাঘের জোলঘাদরকে সরিয়ে রেজায়িকে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে। জোলঘাদর পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে গালিবাফের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে রেজায়ির নিয়োগের পর গালিবাফসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন ভাহিদি বলেন, নিরাপত্তা পর্ষদে রেজায়ির আগমন ‘যুদ্ধের ময়দান ও কূটনীতির মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় এগিয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরোধের নীতি এবং আশাবাদ জাগানো শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার মধ্যেও সমন্বয় তৈরি করতে পারে।’

কেন শঙ্কায় ইসরায়েল

রেজায়ির নিয়োগে সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, রেজায়ি ও আইআরজিসির নতুন প্রধান আহমাদ ভাহিদি ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত। ওই হামলায় ৮৫ জন নিহত হন।

ইসরায়েলের দাবি, ওই ঘটনায় রেজায়ি ও ভাহিদির বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, ‘ইরানি শাসকগোষ্ঠী “সন্ত্রাসবাদের পূজা” করে। এর পরিকল্পনাকারীদের পুরস্কৃত করে এবং ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের পদোন্নতি দেয়।’

Manual5 Ad Code

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি।

রেজায়ির নিয়োগের পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার পুরোনো সামরিক ভূমিকা তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রচার করা হয়েছে। সেখানে তাকে দৃঢ় সামরিক চিন্তাধারার একজন কমান্ডার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এর মধ্যে একটি মন্তব্য রেজায়ি করেছিলেন ২০১৫ সালের জুলাইয়ে। এর কয়েক মাস পরই বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি হয়।

Manual6 Ad Code

ওই চুক্তির আওতায় পরমাণু কর্মসূচিতে বিধিনিষেধ আরোপ করার বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। এর আগে রেজায়ি ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল হামলা হলে তা মোকাবিলার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে রেজায়ি বলেছিলেন, ‘মার্কিনরা যদি ইরানের দিকে বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে চায় বা সামরিক হামলার (স্থল অভিযানের) কথা ভাবে, তবে তারা নিশ্চিত থাকতে পারে, প্রথম সপ্তাহেই আমরা অন্তত এক হাজার মার্কিন বন্দী করব। পরে তাদের প্রত্যেককে মুক্ত করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার করে দিতে হবে। এতে আমাদের অর্থনৈতিক অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

এদিকে ইরানের কট্টরপন্থী মহলেও রেজায়ির নিয়োগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। তাদের মতে, সামরিক সংঘাত মোকাবিলায় অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তিকে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পদে বসানোর মাধ্যমে ইরান তার প্রতিরোধনীতিকে আরও জোরালো করার বার্তা দিয়েছে।

সব মিলিয়ে রেজায়ির নিয়োগ ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে কঠোর অবস্থানের ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে তার অতীত ভূমিকা ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত অবস্থানের কারণে ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।