বিশ্ব অর্থনীতির পুরনো হিসেব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে এক নতুন ব্যবস্থার পথ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক অবরোধকে তোয়াক্কা না করে নতুন বার্তা দিলেন বিশ্বনেতারা।
সম্প্রতি ব্রিকস বিজনেস ফোরামের বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যৌথভাবে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন, নিরাপদ জলপথ এবং স্বাধীন অর্থায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ব্রিকসের এই ধরণের পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করছেন, ঠিক তখনই এই তিন রাষ্ট্রনেতার বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও অবাধ বাণিজ্য
বৈঠকে বাণিজ্যের গতিপথ সচল রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ইসরাইল, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনার কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত স্তব্ধ।
এই পরিস্থিতিতে মোদি সমুদ্রপথে জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের তাগিদ দেন। তিনি জানান, সমুদ্রপথ সুরক্ষিত থাকা এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরই বিশ্ব বাণিজ্যের আসল অগ্রগতি নির্ভর করে। ভারত শুরু থেকেই এই সার্বিক নিরাপত্তার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে আসছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান
Manual4 Ad Code
অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতির এই পরিবর্তনকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গভীর একটি রূপান্তর হিসেবে দেখছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার মতে, বিশ শতকের শেষের দিকে যেসব দেশ বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত, এখন তাদের জায়গা নিচ্ছে নতুন উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো।
Manual1 Ad Code
পুরনো ধনী দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সুবিধা কিংবা উন্নত ব্যবস্থা থাকলেও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনই যে প্রকৃতির নিয়ম, তা তিনি মনে করিয়ে দেন। পুতিনের ভাষায়, বিশ্ব অর্থনীতির এই নতুন বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর ডাক
Manual2 Ad Code
ডলারের ওপর থেকে নির্ভরতা কমানোর বিষয়ে সবচেয়ে সোজা সাপটা বক্তব্য রাখেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
নির্দিষ্ট এক বা দুটি মুদ্রার ওপর পুরো বিশ্ব অর্থনীতি আটকে থাকলে রাজনৈতিক টানাপোড়েনে সাধারণ বাণিজ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে বলে তিনি সতর্ক করেন। এর সমাধান হিসেবে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে নিজস্ব জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি, ব্রিকসের নিজস্ব ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ যেন স্থানীয় মুদ্রায় সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে উন্নয়নমূলক কাজে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে, সেই প্রস্তাবও দেন তিনি।
ট্রাম্পের হুমকি ও ব্রিকসের অবস্থান
এই পুরো ঘটনাটির পটভূমি বেশ স্পর্শকাতর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো যদি ডলারকে চ্যালেঞ্জ করার বা এর বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করে, তবে তাদের ওপর শতকরা ১০ ভাগ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক চাপানো হবে। তবে ট্রাম্পের সেই হুমকিকে কোনো গুরুত্ব না দিয়েই ব্রিকস নেতারা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিলেন।
এই ফোরামের মাধ্যমে যেভাবে উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলো এক ছাতার নিচে আসছে, তাতে স্পষ্ট যে আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে চলেছে।