আজ মঙ্গলবার, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ছায়া মন্ত্রিসভা কী, কেন গঠিত হয়

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ
ছায়া মন্ত্রিসভা কী, কেন গঠিত হয়

Manual8 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সংযোজন। যদিও এই ধারণা বহু বছরের পুরোনো। বাংলার পাঠকদের কাছে সেই পুরোনো রাজনৈতিক ভাবনাটি নতুন করে তুলে ধরা যেতে পারে।

মোটা দাগে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভার’ ভাবনাটি এসেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আইনসভায় সরকারি দলের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধীদলের সদস্যদের শুধু বিতর্কই যথেষ্ট নয়, সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিরোধীদলগুলোকে কিছুটা বাড়তি দায়িত্বও পালন করতে হয়।

তাই সরকারের কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বিরোধীদলের সদস্যরা যখন একটি আনুষ্ঠানিক সমান্তরাল কাঠামো গড়ে তোলেন তখন সেই কাঠামোকে বলা হয় ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’।

অর্থাৎ, বিরোধীদলের সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভার কাজ-কর্মসূচি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে সেখানকার ভুলত্রুটি জনগণের সামনে তুলে ধরবেন।

‘ছায়া মন্ত্রিসভা’

ছায়া মন্ত্রিসভা হলো সংসদের বৃহত্তম বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গঠিত একটি সমান্তরাল মন্ত্রিসভা। এখানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের বিপরীতে একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ থাকেন। এই ‘মন্ত্রী’রা মূলত বিরোধীদলের আইনপ্রণেতা।

যেমন: অর্থমন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

Manual7 Ad Code

তারা ক্ষমতায় না থাকলেও সংশ্লিষ্ট খাতের নীতি, বাজেট, আইন ও কর্মসূচি নিয়ে বিকল্প ভাবনা তুলে ধরেন।

যেভাবে গঠিত হয়

ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া দেশভেদে কিছুটা ভিন্ন হলেও সাধারণ কাঠামো প্রায় একই।

বিরোধী দলনেতার নেতৃত্বে গঠন: সংসদের বৃহত্তম বিরোধী দলের নেতা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেন।

দলীয় সিনিয়র নেতাদের অন্তর্ভুক্তি: অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

পোর্টফোলিও বণ্টন: সরকারের মন্ত্রণালয় কাঠামো অনুসরণ করে দায়িত্ব ভাগ করা হয়।

রাজনৈতিক কৌশলগত ভারসাম্য: অঞ্চল, মতাদর্শ, গোষ্ঠী ভারসাম্যও বিবেচনায় রাখা হয়।

ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ

ছায়া মন্ত্রিসভা কেবল সমালোচনার প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি বিরোধীদের একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প শাসন-প্রস্তুতির কাঠামো।

সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত, ব্যয়, নীতি ও আইন প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে সমালোচনা ও প্রশ্ন তোলে।

বিকল্প নীতি প্রস্তাব দেওয়া: শুধু বিরোধিতা নয়, একই ইস্যুতে নিজেদের নীতিগত সমাধান তুলে করে।

সংসদীয় বিতর্কে নেতৃত্ব: বাজেট, আইন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, সব বড় আলোচনায় ছায়া মন্ত্রীরা খাতভিত্তিক বক্তব্য দেন।

ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের প্রস্তুতি: পরবর্তীতে নির্বাচনে জয়ী হলে এই ছায়া মন্ত্রীরাই প্রায়শই মন্ত্রীর দায়িত্ব পান, ফলে তাদের প্রশাসনিক প্রস্তুতি আগে থেকেই থাকে। এতে বিরোধী দলে থাকা অবস্থাতেই রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসনিক দক্ষতা তৈরি হয়।

জনমত সংগঠিত করা: সংবাদ সম্মেলন, নীতিগত প্রস্তাব-প্রচারণার মাধ্যমে সরকারের বিকল্প রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে।

যেসব দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা

ছায়া মন্ত্রিসভা মূলত গ্রেট ব্রিটেনের ‘ওয়েস্টমিনস্টার’ ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চাকারী দেশগুলোয় বেশি প্রচলিত।

যুক্তরাজ্য

ছায়া মন্ত্রিসভার সবচেয়ে কার্যকর, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রভাবশালী রূপ দেখা যায় যুক্তরাজ্যে। এখানে বিরোধী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয় ‘হিজ ম্যাজেস্টিস মোস্ট লয়্যাল অপজিশন’, অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত কিন্তু সরকারের বিরোধী।

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়াতেও বিরোধী দল সুসংগঠিত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে এবং সংসদীয় কমিটি ও নীতি-নির্ধারণী বিতর্কে সক্রিয় থাকে।

কানাডা

কানাডাতে ছায়া মন্ত্রিসভাকে কখনও ‘অপজিশন ক্রিটিক’ বলা হয়। সেখানে প্রতিটি খাতের জন্য সমালোচক নির্ধারিত থাকে।

নিউজিল্যান্ড

Manual6 Ad Code

নিউজিল্যান্ডেও বিরোধী দল সরকারবিরোধী নীতি বিশ্লেষণ ও বিকল্প পরিকল্পনায় ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে।

ভারত

ভারত ব্রিটেনের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা করলেও দেশটিতে আনুষ্ঠানিক ছায়া মন্ত্রিসভা নেই। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দল অনানুষ্ঠানিকভাবে খাতভিত্তিক মুখপাত্র ও সমন্বয়ক রাখে, যা আংশিক ছায়া মন্ত্রিসভার কাঠামোর মতো কাজ করে।

অন্যান্য দেশ

Manual4 Ad Code

দক্ষিণ আফ্রিকা, জ্যামাইকা, মালয়েশিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোসহ আরও কয়েকটি ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশে বিভিন্ন মাত্রায় ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা আছে।

দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক ছায়া মন্ত্রিসভা সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গঠিত না হলেও বিভিন্ন সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঘোষিত কমিটির পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক ছায়া কমিটি গঠন করেছে।

তবে সেগুলো নিয়মিত সংসদীয় কাঠামোর অংশ নয়। বাজেট ও আইন প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা সীমিত ও দলীয় রাজনৈতিক কৌশলেই বেশি ব্যবহৃত হয়।

ফলে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের পূর্ণাঙ্গ ছায়া মন্ত্রিসভার মতো প্রভাব কখনোই তৈরি হয়নি।

যে কারণে ছায়া মন্ত্রিসভা গুরুত্বপূর্ণ

Manual1 Ad Code

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শক্তিশালী ছায়া মন্ত্রিসভা থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য জোরদার হয়, নীতিনির্ধারণে বিকল্প চিন্তার প্রসার ঘটে, ক্ষমতার পালাবদলে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং একদলীয় আধিপত্যের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

ছায়া মন্ত্রিসভা গণতন্ত্রের ‘অদৃশ্য কিন্তু কার্যকর’ একটি কাঠামো। এটি সরকার পরিচালনা করে না, কিন্তু সরকারকে দেশ পরিচালনায় সতর্ক রাখে। উন্নত সংসদীয় গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা যত শক্তিশালী, শাসনব্যবস্থার জবাবদিহিও তত দৃঢ়, এমনটাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

তথ্য সুএঃ দ্যা ডেইলি স্টার