জাতীয় সংসদ সচিবালয় আজ জানিয়েছে, আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তবে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন বলছে, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে আপত্তি আছে বিএনপির। এবারের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয়ী দলটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের আইনিভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
Manual6 Ad Code
বিএনপি বলছে, সংবিধানের বাইরে গিয়ে তারা এখনই এ ধরনের কোনো পরিষদ গঠনের জন্য প্রস্তুত নয়। তাছাড়া আইনে উল্লেখ না থাকায় পরিষদটির শপথ কে পড়াবেন, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। সব মিলিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন কি না, সেটা এখনও নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার অ্যাভেইলেবল না থাকায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) মঙ্গলবার সকালে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। এটা পড়ানোর সাংবিধানিক এখতিয়ার উনার আছে। এর বাইরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের যে শপথের কথা বলা হচ্ছে, আইনগতভাবে সেটা পড়ানোর এখতিয়ার তার নেই।’
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হলে সংবিধান সংশোধনসহ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে বলে মনে করেন কক্সবাজার থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ।
এ ব্যাপারে তিনি আজ সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ… এটা যদি কন্সটিটিউশনে ধারণ করা হয়, সেই মর্মে অ্যামেন্ডমেন্ট হয় এবং সেই শপথ পরিচালনার জন্য সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিল ফর্ম হয়, কে শপথ পাঠ করাবেন সেটা নির্ধারিত হয়, এতগুলো ‘হয়’-এর পরে তারপরে হলেও হতে পারে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
এর আগে নবনিযুক্ত মন্ত্রীপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি আজ সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘(মঙ্গলবার) সকালে দুই দফায় সংসদ সদস্যদের শপথ হবে। একটা তো তারা (নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা) সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। তার পরবর্তীকালে এই যে সংস্কার, সেটার জন্য শপথ নেবেন।’
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী বিভিন্ন দলই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পক্ষে বলে জানা গেছে। এনসিপি আজই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে।
Manual6 Ad Code
বর্তমান সংবিধানে সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে কিছু বলা নেই। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘আইনগতভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো ভিত্তি নেই। এটার আইনিভিত্তি দিতে পারে পার্লামেন্ট (সংসদ)। কাজেই সেখানে সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে এরকম পরিষদের শপথ পড়ানো হলে সেটি আইনসম্মত কিছু হবে না।’
সংবিধানে না থাকলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদে। সনদটি বাস্তবায়নে গত বছরের ১৩ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন একটি আদেশও জারি করেন। সেখানে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একই পদ্ধতিতে পরিষদেরও প্রথম সভা আহ্বান করা হবে। সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে পরিষদের সদস্যরা সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান নির্বাচন করবেন।
অনলাইন সংবাদপত্র
আরও বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।
কিন্তু এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির আছে কি না, এ নিয়ে আগেই প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। ‘আমরা আগেও বলেছি, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা আছে। সংবিধান মোতাবেক আদেশ জারির ক্ষমতা নেই’ – বিবিসি বাংলাকে বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
Manual1 Ad Code
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদও একই কথা বলছেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতি যে আদেশটি জারি করেছেন, সেটি করার ক্ষমতা তাঁর নাই। যদিও আদেশ গেজেট আকারে ছাপানো হয়েছে, কিন্তু নির্বাচনের পর এখন আইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই।’
সংবিধান সংশোধনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মনজিল মোরসেদ, ‘যখন নতুন কোনো সংবিধান তৈরি করা হয়, তখন এ ধরনের পরিষদ গঠন করে সেটার সদস্যদের শপথ গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে তো সংবিধান তৈরি করা হচ্ছে না, সংবিধান তো আছে। সেটা যদি সংস্কারের প্রয়োজন হয়, সংসদই সেটা করতে পারে। তার জন্য আলাদা পরিষদ গঠনের দরকার নেই।’