আজ বৃহস্পতিবার, ২০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টোকিও থেকে ওয়াশিংটন: কার ছকে বাঁধা পড়ছে আগামী সরকার?

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০৩:৫৪ অপরাহ্ণ
টোকিও থেকে ওয়াশিংটন: কার ছকে বাঁধা পড়ছে আগামী সরকার?

Manual8 Ad Code

মুনজের আহমেদ চৌধুরী

বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর মাত্র দিন কয়েক বাকি। একদিকে দেশের মানুষ বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের অপেক্ষায়, আরেকদিকে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের তদারকির বাইরে গিয়ে এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার ফলাফল হবে বহুদূরব্যাপী। রুটিন কূটনীতির মোড়ক দেখিয়ে তারা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এমন সব প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য চুক্তিতে জড়াচ্ছে, যা এই সরকার ক্ষমতা ছাড়ার দীর্ঘ সময় পরও বাংলাদেশকে একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক কক্ষপথে আবদ্ধ করতে পারে।

বর্তমানে যা ঘটছে তা কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং এটি এক ধরনের ‘পলিটিক্যাল প্রি-এম্পশন’ বা আগাম হস্তক্ষেপ; যেখানে ভোটাররা রায় দেওয়ার আগেই অনির্বাচিত একটি প্রশাসন দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর যতটুকু সম্ভব আগাম নিজেদের মতো করে ঢেলে সাজাচ্ছে।

শেষ মুহূর্তের তোড়জোড়: অস্ত্র, চুক্তি ও কূটনৈতিক অস্থিরতা

এই সরকার গঠন হওয়ার পর থেকে সংস্কারসহ বেশকিছু গুরু দায়িত্বে নিজেদের নিয়োজিত করে। অন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো ‘রুটিন কাজ’ তাদের করার কথা নয় বলেও জনগণকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। এখন সরকারের মেয়াদের শেষ সপ্তাহগুলোতে প্রতিরক্ষা খাতে তাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলো লক্ষ্য করলে পরিকল্পিত পরিবর্তনের ছক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে ৩ ফেব্রুয়ারি, জাপানের সঙ্গে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর’ চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে। যদিও এটিকে একটি পদ্ধতিগত কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আদতে এটি একটি বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বার্তা। এই চুক্তি বাংলাদেশকে জাপানি রাডার সিস্টেম এবং পেট্রোল ভেসেলের মতো অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহের পথ খুলে দিয়েছে। এর মাধ্যমে ঢাকাকে জাপানি এবং পরোক্ষভাবে মার্কিন-ঘেঁষা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নিরাপত্তা বলয়ে শক্তভাবে নোঙর করানো হলো। গত ১৮ মাস ধরে চীন ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সরে আসার যে পরিকল্পিত প্রক্রিয়া চলছিল, এই চুক্তি তারই ধারাবাহিকতা।

তবে এই দিকবদলের ক্ষেত্রে কৌশলগত সামঞ্জস্যের অভাব স্পষ্ট; যা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই সামনে নিয়ে আসে। চীনের জে-১০ যুদ্ধবিমানের প্রতি প্রাথমিক আগ্রহ বাদ দিয়ে ব্যয়বহুল পশ্চিমা প্ল্যাটফর্ম, যেমন- ইউরোফাইটার টাইফুনের দিকে ঝুঁকে গেছেন নীতিনিধারকরা। বিস্ময়কর হলো, প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান-চীনের যৌথ প্রযোজনার জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি নিয়ে আলোচনার গুঞ্জন। এ অবস্থা কোনও সুচিন্তিত সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় না; বরং এটি পুরোনো সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন বিচ্ছিন্ন করতে যতদূর পারা যায়, তারই একটি মরিয়া প্রচেষ্টা। বিশেষ করে জেএফ-১৭ এর প্রসঙ্গটি পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষের সঙ্গে গভীর মতাদর্শগত ও ভূ-রাজনৈতিক সখ্য গড়ার সেতু হিসেবে কাজ করছে।

Manual8 Ad Code

তুরস্ক সমীকরণ: মতাদর্শ ও প্রভাবের খেলা

Manual6 Ad Code

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো আঙ্কারার সঙ্গে গড়ে তোলা অতি-উষ্ণ সম্পর্ক। এটি সাধারণ প্রতিরক্ষা কেনাকাটার বাইরেও বিস্তৃত। যার মধ্যে ইতোমধ্যেই তুর্কি বোরান হাউইৎজার এবং টিআরজি-৩০০ রকেট সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এই সম্পর্কের পেছনে একটি গুরুতর রাজনৈতিক অভিযোগের ছায়া রয়েছে, নির্বাচনের আগে তুরস্ক বাংলাদেশের ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তিকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তুরস্কের স্বার্থ এখানে দ্বিমুখী: দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি লাভজনক বাজার তৈরি করা এবং তাদের নিজস্ব ঘরানার পলিটিক্যাল ইসলামের প্রভাব বিস্তার করা। প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং গভীর সম্পর্কের মাধ্যমে ইউনূস প্রশাসন দৃশ্যত তুরস্ককে তাদের কাঙ্ক্ষিত সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার একজন অপ্রকাশ্য প্রভাবক হিসেবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, যে ব্যবস্থাটি হবে আঙ্কারার দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ওয়াশিংটন চুক্তি: পশ্চিমা বলয়ে আবদ্ধকরণ

Manual7 Ad Code

নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় শুল্ক চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি অর্থনৈতিকভাবে লোভনীয় হলেও, এই চুক্তির সঙ্গে কিছু বাধ্যতামূলক শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট মার্কিন পণ্য, বিশেষ করে বোয়িং বিমান ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, যা কয়েক বিলিয়ন ডলারের এবং কয়েক দশকব্যাপী একটি ক্রয় সিদ্ধান্ত।

নির্বাচনের কয়েক দিন আগে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের পক্ষে সার্বভৌম দেশকে এমন বিশাল পুঁজি-নিবিড় কৌশলগত আমদানির প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করা নজিরহীন। এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে পশ্চিমা-ঘেঁষা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের শেকলে এমনভাবে বেঁধে ফেলা, যাতে ভবিষ্যতে সরকার অপেক্ষাকৃত ভালো কোনও সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয় বা বিকল্প কোনও চিন্তা চুক্তিগত এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।

কৌশলগত ভাগ্য নির্ধারণ

Manual5 Ad Code

জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি)। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি নির্ধারিত ৯ ফেব্রুয়ারি; যার মূল বিবরণ ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ বা গোপনীয়তা চুক্তির আড়ালে রাখা হয়েছে। প্রশ্নটা হলো উদ্দেশ্য নিয়ে। শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় নীতিতে এই হুলস্থুল কেন? ছাত্র-জনতার লাশের বিনিময়ে পাওয়া ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থবহ ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদির সংস্কারের কতটুকু তারা করতে পেরেছে এ সরকার, সেটি বড় প্রশ্ন।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও সংহত করতে সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনও উদ্যোগ নেয়নি, এমনকি ১০ মাসের বেশি সময় ধরে সুপারিশগুলো নিয়ে চরম অনাগ্রহ দেখিয়েছে।

যে সংস্কারের কথা বর্তমান সরকার শুরু থেকে বলছে, সেই অর্থবহ ইতিবাচক সংস্কারের বাস্তবায়ন কতটা দৃশ্যমান?

অনেক ঢাকঢোল পেটানো উদ্যোগ যেগুলো দেশের জন্য, দেশের অর্থবহ ইতিবাচক পরিবর্তনের সোপান হতে পারতো, সেগুলো রেখে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এসে তড়িঘড়ি করে বিদেশি চুক্তিতে তুমুল মনোযোগের প্রকৃত কারণ একদিন নিশ্চয়ই সামনে আসবে।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল হলেও বরং এমন একটি নীতি বা কৌশল বর্তমান সরকার তৈরি করতে চায়, যাতে নির্বাচনের পরে নতুন সরকার না চাইলেও বর্তমান সরকারের চুক্তিগুলি টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য সম্পর্ক পাকা করে এবং তুরস্কের দিকে ঝুঁকে, অন্তর্বর্তী সরকার পরবর্তী প্রশাসনের ভূ-রাজনৈতিক গতিপথ প্রভাবিত করতে আগে থেকেই কাজ করছে।

ওয়াশিংটন থেকে টোকিও হয়ে আঙ্কারা– প্রতিটি শেষ মুহূর্তের চুক্তি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত হতে যাওয়া আগামী সরকারের সার্বভৌম পছন্দের সুযোগকে সংকুচিত করবে। নির্বাচনের পরে যদি নতুন সরকার খুব যুক্তিসঙ্গত কারণেও কোনও দেশের সঙ্গে বর্তমান সরকারের তড়িঘড়ি করে করা চুক্তি বাতিল বা নবায়ন করতে না চায়, তাহলে সেই প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সরকার শুরুতেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়বে।

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক

তথ্য সুএঃ বাংলা ট্রিবিউন