আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন কীভাবে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে?
আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন কীভাবে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে?
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০১:৪৬ অপরাহ্ণ
Manual8 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়াই চলছে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি।
২০১৪ সাল থেকে একাধারে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর আবারো সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আসন্ন নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশে পর পর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্যে ২০১৪ আর ২০২৪ সালে বিএনপি ও জামায়াত অংশ না নেয়ায় একতরফা নির্বাচন হয়েছে।
আর আঠারো সালের নির্বাচনকে সমালোচকেরা বলে থাকেন রাতের ভোট। আসন্ন নির্বাচনও সব দলের অংশগ্রহণে হচ্ছে না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেনা ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের শরিক মিত্র দলগুলোর কয়েকটি।
এই নির্বাচনে মূলত অংশ নিচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি বিশেষ করে ২০১৪ এবং ২৪ সালের ভোটে অংশ না নেয়া আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত।
ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও বাতিল করে দিয়েছে।
এ অবস্থায় দলটি ভোটে অংশ নিতে না পারলেও বিতর্কের কিছু নেই বলে মনে করে আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের দৃষ্টিতে এই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক হবে।
ছাব্বিশের নির্বাচনটিও ভবিষ্যতে কারো কারো কাছে একতরফা হিসেবে মূল্যায়ন হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা দুই জোটের নেতারা মনে করেন, সর্বস্তরের ভোটার, বৈধ দল ও প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেই হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, ভোটার উপস্থিতির মাধ্যমেই আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে।
বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা বুঝি ভোটারদের অংশগ্রহণ। পার্টিকুলার কোনো দলের নয়।
“নির্বাচনটা অনুষ্ঠিত হয় একটা আইনের ভিত্তিতে। দেশে ইলেকশন কমিশন আছে, একটা নির্বাচনী আইন আছে সাংবিধানিক একটা বিধি আছে। আপনারা দেখবেন সেই আইনের ভিত্তিতে যারা যারা যোগ্য হবেন, আইনের মধ্যে যারা থাকবেন- তারা ইলেকশন করবেন, দ্যাট ইজ কল পার্টিসিপেটরি, দ্যাট ইজ কল ইনক্লুসিভ।
“নির্বাচনে যোগ্য লোকদেরকে নির্বাচন করতে না দিলেই সেটা হবে অংশগ্রহনহীন ইলেকশন” বলেন জামায়াত নেতা মি. পরওয়ার।
বাংলাদেশে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এবার অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রশ্নে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।
তার যুক্তি, বর্তমানে দেশের নিবন্ধিত সব দলই ভোটে অংশ নিচ্ছে, তাই এটি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন।
“ইনক্লুসিভ ইলেকশন মানেই হচ্ছে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন। বিকজ আওয়ামী লীগ কোনো পলিটিক্যাল পার্টি না। তারা একটা মাফিয়া গোষ্ঠী, তারা রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়েছে, তারা এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে, জনরায় হয়েছে।
“গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে তারা এদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি চায় না। ইনক্লুসিভ মানে যারা এখন রাজনীতিতে রেজিস্ট্রার্ড আছে, ইলেকশন কমিশনের সাথে নিবন্ধন আছে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে”।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলছেন, “যদি দুএকটা ছোট খাট দল ইলেকশনে অংশগ্রহণ না করে থাকে, সেটা সবসময় হয়ে থাকে তাতে কিছু যায় আসে না। নির্বাচনের ইনক্লুসিভ চরিত্র থাকবে গ্রহণযোগ্য হবে বিশ্বাসযোগ্য হবে।”
সালাহউদ্দিন আহমদ
বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রধান জোট আসন্ন নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছে। আওয়ামী লীগ না থাকায় এই দুই জোটের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
দুই জোট মনে করছে, ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। তবে তাদের এই প্রত্যাশা পূরণ হবে কিনা- সেটি নিয়ে সন্দেহ এবং আশঙ্কার কথা শোনা যায় জাতীয় পার্টির অবস্থান থেকে ।
দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আনকন্ট্রোলড আনচেকড একটা ইলেকশনের দিকে বাংলাদেশ যাচ্ছে এবং ভোটের দিনে এখানে স্থানীয় মব, স্থানীয় শক্তি, স্থানীয়ভাবে যারা হোল্ড রাখে, তারা যা চাইবে তাই হবে।
“বাধা দেয়ার মতো কোনো শক্তি এখন পর্যন্ত আমরা দেখতে পারছি না। এই যে বল্গাহীন, বাধা না দেয়ার ক্ষমতা ছাড়া একটা ভোট হচ্ছে সেটারতো বিকল্প আরো অনেক কিছু হওয়া উচিত ছিল। জাতীয় পাটি জামাতের নিষিদ্ধের সময় প্রতিবাদ করেছিল, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সময়ও প্রতিবাদ করেছে” বলেন মি.পাটোয়ারী।
অতীতে আওয়ামী লীগের জোটের সঙ্গে থাকা জাতীয় পার্টি এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলছেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা আওয়ামী লীগকে কোনো পলিটিক্যাল সলিউশন দেয়নি। আবার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ঘটনাও কিন্তু বিএনপি- জামায়াতকে কোনো পলিটিক্যাল সলিউশন দিল না।
“ইনক্লুসিভ ভোট ছাড়া ফুল ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন হবে না। পরের ভোটে গিয়ে হয়তো আমরা একটা ফুল ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনের দিকে যেতে পারি। সেদিকে যেতে গেলে আগেতো একটা সেমি ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন লাগবে। আমি মনে করি সেদিক থেকে এবারের ভোটে অনেক সমস্যার সমাধান হবে” বলেন মি. পাটোয়ারী।
জাতীয় পার্টি মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী
মি. পাটোয়ারীর কথায়, ভোট না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।
“এই ইলেকশনটা কিন্তু একটা ট্রানজিশন, একটা সেমি ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন। আওয়ামী লীগেরও কিন্তু একটা ট্রানজিশন প্রয়োজন। সকলেরই কিন্তু একটা শিফট প্রয়োজন। ভোট না হলে বর্তমান সরাকার দেশ চালাতে পারবে না।”
অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনী রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “প্রকৃত অংশগ্রহনমূলক যেটাকে আমরা বুঝি যে সকল রাজনৈতিক দল মত সবার অংশগ্রহন সেটা এবার আসলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
“সামনে এটা হয়তো পরের নির্বাচনে হলেও হতে পারে যদি আওয়ামী লীগ তার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করে পর্যালোচনা করে এবং বিচারগুলো যদি হয়ে যায়, তারপরে আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই একভাবে আসতে পারে।
Manual6 Ad Code
“এখন ওই আংশিকভাবেই নির্বাচন করতে হবে। তারপরেও নির্বাচন কতটা ঠিকঠাক হয় সেটাও এখন উদ্বেগের বিষয়” বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
অতীতে নির্বাচনগুলোর বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ এই দুই দলেরই ভোটার সবচেয়ে বেশি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও দলটির সমর্থক ভোটাররা রয়েছেন; তাদের ভোট জয় পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের কর্মী সমর্থকদের ভোটদানে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। সেটি ভোটার উপস্থিতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে, সেটি নিয়ে দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।
বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটার উপস্থিতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না।
“এদেশের মানুষ এবং নতুন প্রজন্ম যারা নতুন ভোটার হয়েছে, যাদের বয়স আঠারো থেকে ত্রিশ পঁয়ত্রিশের মধ্যে তারা স্বাধীনভাবে মুক্ত পরিবেশে ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, উদগ্রীব হয়ে আছে, এই ভোটারকে কেউ থামাতে পারবে না।
“আর এখানে একটা ক্ষুদ্র অংশ যদি নিজেরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না চায় বা ভোট দিতে না চায়, সেই স্বাধীনতাতো তাদের আছে। তবে আমি মনে করি না যে, তাদের সংখ্যা খুব একটা বেশি হবে” বলেন বিএনপি নেতা মি.আহমদ।
Manual1 Ad Code
জামায়াত জোটের পক্ষ থেকেও মনে করা হয় যে, ভোটার উপস্থিতি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।
তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলছেন, আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়, সেটি ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে।
“যদি আওয়ামী লীগ অলটুগেদার ভোট বর্জন করে, তাহলে কিন্তু কাস্টিংটা অবৈধভাবে করতে হবে। এবং সেটাকে কেউ লুকাতে পারবে না। বাংলাদেশে ৪২ হাজার সেন্টারে ভোট হবে, সেখানে অবৈধ কাস্টিংগুলো একসময় ন্যাকেড হয়ে যাবে এবং ভোটটা তখন প্রশ্নবিদ্ধ হবে”।
শামীম পাটোয়ারি এ-ও বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসুক, এটা আমরা সবাই চাচ্ছি এবং কী করলে আসবে- সেটা সবাইকে একটা সমঝোতাও করতে হবে।
Manual5 Ad Code
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এবার ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পড়লে প্রশ্ন উঠতে পারে।
আনু মুহাম্মদের ভাষায়, “ফিফটি পার্সেন্টের বেশি ভোট না হলেতো সেটা গ্রহণযোগ্য হয় না। আর এতদিন পরে নির্বাচন হচ্ছে এটাতো আরো বেশি হবার কথা। সেটা যদি না হয় সেটা একটা ব্যর্থতা হবে।
Manual3 Ad Code
“এখন এটা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশন কতটা আস্থার অবস্থা তৈরি করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার কতটা আন্তরিকতার সাথে নির্বাচনে যায়। এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে এটা স্পষ্ট করতে হবে যে, তারা কোনো পক্ষপাতিত্ব করছে না। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনেরও এটা একটা পরীক্ষা” বলেন আনু মুহাম্মদ।
আসন্ন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে- এমন বিশ্লেষণ আছে। প্রথমত ভোটার উপস্থিতি, দ্বিতীয়ত নিরাপত্তা ও ভোটের পরিবেশ, যা শান্তিপূর্ণ অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে। এখানেও দুশ্চিন্তা দিক রয়েছে বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ।
“জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু যারা তাদের মধ্যে আগের বিভিন্ন নির্বাচনে আমরা দেখছি যে, তাদের মধ্যে একটা আতঙ্কের অবস্থা তৈরি করা হয়, যাতে নির্বাচনে তারা ভোট দিতে না যায়।
“তাদের নির্বাচনে যাওয়া এবং না যাওয়া- দুই দিক থেকে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। সেই জায়গাটাতো নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা আসে কারণ তারা একটা বড় অংশ।”
সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের মধ্যেও আতঙ্ক আছে বলে বলছেন আনু মুহাম্মদ
“এখন মাজার আক্রান্ত হচ্ছে, বাউলরা আক্রান্ত হচ্ছে- এদের সাথেতো বিশাল জনগোষ্ঠী। এখন তারা যদি দেখে যে, আমরা একটা সহিংসতার মধ্যে পড়বো বা যারা এখানে নির্বাচন করছে বা দাপটের সাথে চলাফেরা করছে তারা আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে, তাহলেও ভোটসংখ্যা অনেক কমে যাবে।”