আজ রবিবার, ১১ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সহনশীলতা, সহানুভূতি আর সংলাপে গড়ি শান্তির বিশ্ব

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ণ
সহনশীলতা, সহানুভূতি আর সংলাপে গড়ি শান্তির বিশ্ব

Manual7 Ad Code
উৎফল বড়ুয়া
শান্তি মানবসভ্যতার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি। যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতা ও বিভেদের বিপরীতে শান্তি, সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই পারে একটি সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে। প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৮১ সালে রেজুলেশন ৩৬/৬৭-এর মাধ্যমে দিবসটি প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রথম আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালিত হয় ১৯৮২ সালে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে রেজুলেশন ৫৫/২৮২-এর মাধ্যমে ২১ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের স্থায়ী তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং দিনটিকে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরতি ও অহিংসার দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের মূল উদ্দেশ্য শুধু যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো নয়; বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিকতা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কারণ শান্তি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, শান্তি হলো এমন একটি পরিবেশ যেখানে মানুষ নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার ও সমান সুযোগ নিয়ে বসবাস করতে পারে। জাতিসংঘও শান্তিকে কেবল যুদ্ধহীনতা হিসেবে না দেখে নিরাপত্তা, মর্যাদা, সহযোগিতা ও মানবিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হলো নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের জাপানি শান্তির ঘণ্টা (Japanese Peace Bell)। ১৯৫৪ সালের ৮ জুন জাপানের জাতিসংঘ সমিতির পক্ষ থেকে ঘণ্টাটি জাতিসংঘকে উপহার দেওয়া হয়। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের দান করা মুদ্রা দিয়ে এটি নির্মিত। প্রতিবছর শান্তি দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এই ঘণ্টা বাজানো হয়, যা বিশ্ববাসীকে যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি সামাজিক বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ, বৈষম্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাসও শান্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সংকট মোকাবিলায় অস্ত্রের চেয়ে সংলাপ, সংঘাতের চেয়ে সমঝোতা এবং প্রতিহিংসার চেয়ে সহমর্মিতা বেশি কার্যকর। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার নয়; প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেন।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের প্রতিপাদ্য “Invest in Peace: For Everyone, Everywhere, Every Day”, যার মূল বার্তা হলো সবার জন্য, সর্বত্র এবং প্রতিদিন শান্তিতে বিনিয়োগ করা। জাতিসংঘের এবারের বার্তায় সংলাপ, মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক সংহতি এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আমাদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা সমাজ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই শান্তির চর্চা প্রয়োজন। মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু মতের ভিন্নতা যেন কখনো বিদ্বেষ বা সংঘাতে রূপ না নেয়। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভিন্নমতকে সম্মান করা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং প্রয়োজন হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়াই হতে পারে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের প্রথম পদক্ষেপ।
আসুন, আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসে আমরা প্রত্যেকে শান্তির পক্ষে দাঁড়াই। হিংসা ও বিভেদ ভুলে সহনশীলতা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা করি। সংলাপকে করি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রধান পথ এবং মানবিকতাকে করি আমাদের পথচলার শক্তি। আমাদের ছোট ছোট ইতিবাচক উদ্যোগই একদিন বৃহত্তর শান্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আসুন, শান্তি হোক প্রতিটি হৃদয়ের অঙ্গীকার, সম্প্রীতি হোক আমাদের পথচলার শক্তি। সহনশীলতা, সহানুভূতি আর সংলাপে গড়ে উঠুক শান্তির বিশ্ব। ছড়িয়ে পড়ুক শান্তির বার্তা, দৃঢ় হোক সম্প্রীতির বন্ধন।
লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবী, মানবাধিকারকর্মী এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ।