ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জেলায় হামলা, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাবে নির্বাচন-পরবর্তী চার দিনে সারাদেশে ৮৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন চারজন ও আহত অন্তত ২০৩ জন।
এসব ঘটনায় ১৫টি মামলা ও ২৫টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। গ্রেপ্তার সংখ্যা ১১ জন। সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে খুলনা বিভাগে। এই সংখ্যা ২৬। দ্বিতীয় অবস্থানে রাজশাহী বিভাগ, ১৮টি সহিংসতা ঘটেছে। ঢাকা বিভাগ তৃতীয় স্থানে, সহিংস ঘটনা ১৩টি। চতুর্থ স্থানে চট্টগ্রাম বিভাগে ৯টি ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ছয়টি, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে দুটি করে সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
Manual2 Ad Code
অবশ্য ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্সের (ইডব্লিউএ) হিসাবে নির্বাচনের দিন ও তার আগের দুই দিনে সারাদেশে ২১০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি: প্রতিবেদন ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
Manual4 Ad Code
মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির সমর্থকদের সম্পৃক্ততা বেশি দেখা গেছে। কয়েকটি এলাকায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষ হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি জোট ২১২টি, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট ৭৭টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে বিজয়ী হন। দুটি আসনের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, অনেক জায়গায় ফল ঘোষণার পর বিজয়ী-পরাজিত পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, আগের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে।
পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গত ১৩ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি চার দিনে সারাদেশে ৮৪টি সহিসংতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নির্বাচনের পরদিন ১৪টি, দ্বিতীয় দিন ৪০টি, তৃতীয় দিন ১৫টি ও চতুর্থ দিনে ১৫টি হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৪টি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং তিনটি নির্বাচনী ক্যাম্প
ভাঙচুর করা হয়। দুটি স্থাপনা ও একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ করা হয়। সংঘর্ষ ও মারধরের ঘটনা ৪৪টি। সহিংসতায় নিহত হন চারজন। আহত ২০৩ জনের মধ্যে অনেকে চিকিৎসা নিয়েছেন স্থানীয় হাসপাতালে। এসব ঘটনায় ১৫টি মামলার পাশাপাশি ২৫টি জিডি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১১ জনকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং ভিডিও ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে কাজ করছে পুলিশ।
সহিংসতায় প্রাণ যায় চারজনের
নির্বাচনের পরদিন বাগেরহাটের কচুয়ার চিতাবাড়ি গ্রামে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থক নিহত হন। নিহত ওসমান সরদার সদর উপজেলার পরনওয়াপাড়া গ্রামের শাহজাহান সরদারের ছেলে। গত শনিবার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
ভোলার চরফ্যাসনে বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধে একজন নিহত হন। গত শনিবার রাতে শশীভূষণ থানাধীন রসুলপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কলেরহাট রাস্তার মাথায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতের নাম আবদুর রহিম (৪৫)। তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে সহিংসতায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে বিএনপি কর্মীর ছেলে ইমন (১২) ও মুন্সীগঞ্জে নির্বাচনের পরদিন দুই পক্ষের বিরোধে মো. জসিম নায়েব (৩৫) নামে একজন নিহত হন।
খুলনা বিভাগে সহিংসতা বেশি
Manual3 Ad Code
গত শুক্রবার কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মির্জাপুরে আধিপত্য নিজে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। একই দিন ঝিনাইদহ সদরের কালিচরণ শাহপাড়ায় নির্বাচনে জয়-পরাজয় নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্বে জামায়াত-বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়। এ ছাড়া এই জেলার হরিণাকুন্ড থানার জোড়াপুকুরিয়া এলাকায় ভোট চাওয়ার জেরে শুক্রবার বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
শুক্রবার মেহেরপুরের গাংনী থানার জোড়পুকুরিয়া বাজার এলাকায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।
বিভিন্ন জেলায় হামলা-সংঘর্ষ
শনিবার নাটোরের গুরুদাসপুর থানার বিন্যাবাড়ী এলাকায় রাজনৈতিক মতাদর্শের জেরে স্থানীয় যুবদল নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নেতার মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। একই দিন নীলফামারীর
ডোমার থানা এলাকায় বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীর মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়।
ঝিনাইদের হরিণাকুণ্ডু থানার জোড়া
পুকুরিয়া এলাকায় ভোট চাওয়ার জেরে শুক্রবার বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। একই দিন নেত্রকোনার পূর্বধলার নারায়ণভহর এলাকায় জামায়াতের সমর্থক-কর্মীরা আনন্দ মিছিল করার সময় বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয় ভাঙচুর করে। শনিবার পাবনার সাঁথিয়ার রামকান্তপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। গত রোববার
নেত্রকোনার কেন্দুয়ার
আশুজিয়া এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর কয়েকজন সমর্থক বিএনপির প্রার্থীর দুজন সমর্থকের ওপর হামলা চালায়।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন সমকালকে বলেন, এবার নির্বাচন-পরবর্তী সহিসংসতার ঘটনা তুলনামূলক খুবই কম। ঘটনাগুলোর তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েকজনকে।