আজ রবিবার, ২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুষ্টিয়া সুগার মিলে নষ্ট হচ্ছে শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি: পূনরায় চালুর দাবি

editor
প্রকাশিত মে ৮, ২০২৬, ০৩:২৮ অপরাহ্ণ
কুষ্টিয়া সুগার মিলে নষ্ট হচ্ছে শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি: পূনরায় চালুর দাবি

Manual2 Ad Code

শরিফুল হক পপি, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া সুগার মিল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের মুখে প্রায় ১০০ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ। স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারন জনগণ প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন।

১৯৬১ সালে মিলটি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৫-৬৬ আখ মাড়াই মৌসুম থেকে চিনি উৎপাদন শুরু করে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার এই প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয়করণ ঘোষণা করে। শুরু থেকে বেশ কয়েক বছর লাভজনক অবস্থায় ছিল মিলটি। কিন্তু নব্বই দশকের পর থেকে ধারাবাহিক লোকসানের কবলে পড়ে। এক পর্যায়ে ৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান গুনে ২০২০-২১ অর্থবছরে আনুষ্ঠানিকভাবে আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানটি। বন্ধের সময় এর মোট পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ৬০৬ কোটি ৫ লাখ টাকা ছিল বলে জানা যায়।

জানা যায়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সীমাহীন দুর্নীতি এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগের কারনে ব্যাপক লোকসানের কবলে পড়ে মিলটি। যার ফলে বন্ধ ঘোষণা কর হায়। বন্ধ থাকলেও এখন কর্মরত আছেন ৭৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের পেছনে প্রতি মাসে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা। বর্তমানে মিলের একমাত্র সক্রিয় কাজ হলো ২২০ একর জায়গার মধ্যে কিছু জমি ও পুকুর লিজ দেওয়া, যা থেকে বছরে আয় মাত্র ২৭ লাখ টাকা।

দীর্ঘদিন ধরে মিলটি বন্ধ থাকায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিভিণ্ন ধরনের মূল্যবান যন্ত্রাংশ এখন নষ্ট হওয়ার পথে। বছরের পর বছর অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা এসব যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কুষ্টিয়া রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হামিদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তেল-গ্রিজ দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ না করলে যন্ত্রপাতির ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ নষ্ট হতে পারে।

এদিকে কুষ্টিয়া সুগার মিলের কাছে ২০২ শ্রমিক-কর্মচারীর প্রায় ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে। মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর থেকেই এই বিপুল পরিমাণ পাওনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।

অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস জানান, মিল বন্ধের সময় ২৬২ জনের প্রায় ২১ কোটি টাকা বকেয়া ছিল। ২০২৫ সাল পর্যন্ত আরও ১০০ শ্রমিকের প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বকেয়া। অর্থের অভাবে শ্রমিকরা সুচিকিৎসা করাতে পারছেন না এবং সন্তানদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত থমকে গেছে। ফলে দ্রুত বকেয়া পরিশোধ ও মিল চালুর দাবি জানান তিনি।

Manual1 Ad Code

এছাড়াও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি আবারও চালু করা দরকার। তারা মনে করেন, সরকার সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনরায় চালু করলে অনেকের বেকার সমস্যা সমাধান সহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। কুষ্টিয়ার সাধারন জনগণ সহ স্থানীয় সচেতন মহল প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর দাবি জানান।

এদিকে মিলের আশপাশ অঞ্চলের চাষিরা আখ চাষে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে যে বীজ দেওয়া হয় তা উচ্চফলনশীল নয় এবং ফসল ঘরে তুলতে ১৮ মাস সময় লাগে, যেখানে অন্যান্য ফসল বছরে তিনবার হয়।

সুগার মিল এলাকার আখ চাষি মনিরুজ্জামান আতু জানান, এবার পাঁচ চাষি সুগার মিলের প্রায় ২০ একর জমি লিজ নিয়ে আখ চাষ করছেন। নানা সংকট এবং চ্যালেঞ্জের কারণে চাষিরা দিন দিন আখ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, আখ চাষিদের সরকারিভাবে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। আবার যে প্রণোদনা আসে সেটিও হাতেগোনা কয়েকজন পান। এছাড়া সরকারিভাবে যে বীজ দেওয়া হয়, সেটিও উচ্চ ফলনশীল জাতের নয়। যে কারণে বিঘাপ্রতি ফলন অত্যন্ত কম। আখ চাষ করে ফসল ঘরে তুলতে ১২ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। অথচ অন্য ফসলের ক্ষেত্রে বছরে তিনটি ফসল করা যায়।

কুষ্টিয়া সুগার মিল আধুনিকায়ন ও রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু মনি সাকলায়েন এলিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মিলটি চালুর বিষয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করছি। সরকারের কাছে জোর দাবি, অবিলম্বে কুষ্টিয়া সুগার মিল চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হোক।

তিনি আরও বলেন, আখ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংকট রয়েছে। কেননা, আখ চাষে প্রায় এক থেকে দেড় বছর সময় লাগে। আর আখ চাষের ক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা চাষিরা তেমন পান না।

Manual3 Ad Code

চিনিকলটি পুনরায় চালুর বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, মিলটি পুনরায় চালুর জন্য বর্তমান সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। মিলটি চালু করতে হলে মাড়াই মৌসুমে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন আখ লাগবে। তবে সনাতনী পদ্ধতিতে চাষ করলে বছরে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি আখ উৎপাদন হবে না। সেজন্য উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি।

Manual5 Ad Code

তিনি বলেন, যদি উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ চাষ করতে পারি তাহলে দুই হাজার একর জমিতেই বছরে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন সম্ভব হবে। আশার কথা, চলতি বছর অনেক কৃষকই উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ চাষ শুরু করেছেন।

Manual5 Ad Code

এ বিষয় কুষ্টিয়া সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা আক্তার জানান, কুষ্টিয়াসহ ছয়টি সুগার মিল কবে নাগাদ চালু হতে পারে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এছাড়া যন্ত্রপাতি কতটুকু কার্যক্ষম তা যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব নয়। তবে মিলটি চালুর বিষয়ে আমরা আশাবাদী।

কুষ্টিয়া চিনিকলের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সাইফুল ইসলাম জানান, যেসব চিনিকল বন্ধ সেসব প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকারের যথেষ্ট সদিচ্ছা আছে। খোঁজ-খবর নিয়ে যতটুকু জানতে পেরেছি, সরকার বন্ধ চিনিকল পুনরায় চালুর চিন্তা করছে।