হবিগঞ্জ পিবিআই-এর পুলিশ পরিদর্শক (ওসি), কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক রাজীব কুমার দাশকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘এক রূপে বহুরূপী’।
শনিবার ২৫ শে জুলাই সকালে বাংলা একাডেমির কবি আল মাহমুদ লেখক কর্নারে ভাবনগর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে চর্যাগান, আবৃত্তি, প্রবন্ধ পাঠ, সাহিত্য আলোচনা এবং পাপেট শোর সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক আবহ।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন সমকালীন বাংলা সাহিত্যের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর রাজীব কুমার দাশ। পেশাগত দায়িত্বে তিনি বর্তমানে হবিগঞ্জে পিবিআই-এর ওসি হিসেবে কর্মরত থাকলেও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে ইতোমধ্যে দেশের সাহিত্যাঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর কবিতা, গবেষণা ও মানবিক জীবনদর্শনকে কেন্দ্র করেই আয়োজনটির পরিকল্পনা করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পরিবেশিত হয় চর্যাগান। ভাবনগর ফাউন্ডেশনের শিল্পীরা চর্যাপদের গান পরিবেশন করে প্রাচীন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরেন। আয়োজকরা জানান, ২০১১ সাল থেকে চর্যাপদের পুনর্জাগরণ, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সেমিনার, সাধুসঙ্গ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা কাজ করে আসছেন। এবার সেই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে সমকালীন কবিতা ও সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা।
পরে অনুষ্ঠিত হয় রাজীব কুমার দাশের কবিতাভুবন নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনা পর্ব। শুরুতে তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেন নূরুননবী শান্ত। এরপর গবেষক হাসান দবির উদ্দিন ও নাট্যকার-গবেষক শরণ এহসান কবির সাহিত্যকর্ম, কাব্যচিন্তা ও সৃষ্টিশীল দর্শন নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
আলোচনা পর্বে অংশ নেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক গওহর গালিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক জোবায়ের আবদুল্লাহ, বাংলা একাডেমির সহপরিচালক কবি ও গবেষক আসাদ আহমেদ এবং কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক শাহেদ কায়েস।
আলোচকরা বলেন, রাজধানীর বাইরে অবস্থান করেও ধারাবাহিক সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে রাজীব কুমার দাশ সমকালীন বাংলা কবিতায় নিজস্ব স্বর নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় ইতিহাস, পুরাণ, লোকজ সংস্কৃতি, মানবিক বোধ এবং সময়ের বাস্তবতা এক অনন্য শৈলীতে প্রকাশ পায়। সাহিত্য ও সমাজবোধের সমন্বয়ে তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে এক অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরে জন্মগ্রহণকারী রাজীব কুমার দাশ দীর্ঘদিন ধরে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সুখাবতী’, ‘সততা জেনারেল স্টোর’, ‘নিরন্ন ললাট’ এবং ‘তুমি ছাড়া মৌনতা খাবো প্রতিদিন’। সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ড, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, গুণীজনদের সম্মাননা প্রদান এবং প্রকৃতিপ্রেমী মননের জন্যও তিনি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রাজীব কুমার দাশ বলেন, “কবিতা আমার জীবনবোধের অন্যতম আশ্রয়। ইতিহাস, পুরাণ, মানুষ এবং সমকালীন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে আমি নিজেকে ও সময়কে বুঝতে চেষ্টা করি।” এ সময় তিনি তাঁর সদ্য রচিত একটি কবিতা পাঠ করে শোনান, যা উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমীদের প্রশংসা অর্জন করে।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা বিনি ও অর্ণব মল্লিক বইপড়া ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করে এমন পাপেট শো পরিবেশন করেন।
শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি উপস্থিত প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকরাও পরিবেশনাটি উপভোগ করেন এবং পরিবেশনা শেষে দীর্ঘ করতালির মাধ্যমে শিল্পীদের অভিনন্দিত করেন।
আয়োজকদের মতে, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে রাজীব কুমার দাশের বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল যাত্রাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। তাঁদের বিশ্বাস, এ ধরনের আয়োজন সমকালীন বাংলা সাহিত্যচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করবে।