আজ বৃহস্পতিবার, ৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“টিকিট উধাওয়ের নেপথ্যে কারা? সিলেটে কালোবাজারির খোঁজে পিবিআই, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ”

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০১:০০ পূর্বাহ্ণ
“টিকিট উধাওয়ের নেপথ্যে কারা? সিলেটে কালোবাজারির খোঁজে পিবিআই, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ”

Manual3 Ad Code
স্বপন কুমার সিং, নিজস্ব প্রতিবেদক  :
অনলাইনে ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ। অথচ টিকিটের জন্য অপেক্ষায় থাকা বহু যাত্রী তখনও আসন পাচ্ছেন না। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বেশি দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের ট্রেনের টিকিট নিয়ে দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি এবার গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। টিকিট কালোবাজারি ও মজুদদারির সন্দেহে স্ব-উদ্যোগে মামলা করেছেন সিলেটের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লা আল নোমান। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), সিলেট।
মামলার নথি অনুযায়ী, সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা, পারাবত, পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসের টিকিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রীদের অসন্তোষ প্রকাশ হয়ে আসছে। অভিযোগের অন্যতম বিষয়—অনলাইনে টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ট্রেনের টিকিট শেষ হয়ে যায়।
বিশেষ করে শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও সিলেট থেকে যাতায়াতকারী অনেক যাত্রীর অভিযোগ, কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আর আসন পাওয়া যায় না। ফলে নির্ধারিত সময়ে টিকিট কিনতে ব্যর্থ হওয়া যাত্রীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বেশি দামে টিকিট পাওয়ার অভিযোগও করছেন।
টিকিট বিক্রি অনলাইনে হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে ‘অনলাইনেই টিকিট বিক্রি হয়’—এমন ব্যাখ্যাই সামনে আসে। কিন্তু অনলাইনে টিকিট বিক্রির পুরো ব্যবস্থাপনা, টিকিট বরাদ্দ, বিক্রির সময় অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে টিকিট শেষ হয়ে যাওয়া এবং পরে অতিরিক্ত দামে টিকিট পাওয়ার অভিযোগ—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেটিও এখন প্রশ্নের বিষয়।
বিষয়টি আদালতের নজরে আসার পর ট্রেনের টিকিট বিক্রির সরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করেন আদালত। সেখানে নির্দিষ্ট দিনের টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। বিপুলসংখ্যক টিকিট এত অল্প সময়ে কীভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে আদালতের সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারও সহযোগিতায় কোনো চক্র দ্রুত টিকিট সংগ্রহ করে পরে অধিক মূল্যে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজনে পিবিআই, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ পর্যবেক্ষণ করছেন, মাঠে নেমেছেন ।টিকেট কালোবাজারি সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি সিলেটের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কালোবাজারি ও মজুদদারির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে—এমন সন্দেহে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লা আল নোমান স্ব-উদ্যোগে মিস মামলা নম্বর ০১/২০২৬ দায়ের করেন।
মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ সুপার, পিবিআই সিলেটকে নির্দেশ দেন আদালত।
আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) মামলার নথিপত্র পিবিআই সিলেটে পৌঁছেছে। পিবিআই সিলেটের উপপরিদর্শক আব্দুল আহাদ মামলাটির তদন্ত করছেন। তিনি আদালতের স্ব-উদ্যোগে দায়ের করা মামলাটি তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তে অনলাইনে টিকিট বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া, টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার কারণ, টিকিট মজুদের কোনো ঘটনা ঘটছে কি না এবং বেশি দামে টিকিট বিক্রির সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্টেশন থেকে টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম, যোগসাজশ বা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে উঠে আসতে পারে।
এদিকে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম বলেন, রেলের টিকিট অনলাইনে ক্রয় করতে হয়। কেউ কেউ কাউন্টার থেকেও টিকিট নেন। তবে টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়ায় স্টেশন কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই।
মামলাটি এখন তদন্তাধীন। তবে তদন্তে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তা আইনি প্রক্রিয়ায় উঠে আসতে পারে। অনলাইনে টিকিট উন্মুক্ত হওয়ার পর মুহূর্তেই টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার পেছনে আসলে কী ঘটছে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
ট্রেনে নিয়মিত ভ্রমণকারী যাত্রীরা এখন পিবিআইয়ের তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের প্রত্যাশা, টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার নেপথ্যের রহস্য উন্মোচিত হলে দীর্ঘদিনের কালোবাজারির অভিযোগ ও ধোঁয়াশার অবসান হবে এবং সাধারণ যাত্রীদের টিকিট পাওয়া সহজ হবে।
আদালতের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই তদন্ত তাই শুধু একটি মামলার তদন্ত নয়; সিলেট অঞ্চলের ট্রেনের টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সাধারণ যাত্রীর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।