নাটোরে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ঘটনায় আহত ৩৭, আটক ৭
নাটোরে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ঘটনায় আহত ৩৭, আটক ৭
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৫:৫৯ অপরাহ্ণ
Manual3 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
নাটোরে নির্বাচনের পরে জেলাজুড়েই রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হামলা, গুলিবর্ষণ, বাড়িঘর ভাঙচুর ও সংঘাত-সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় সাতজনকে আটকের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারী) সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জেলা জুড়েই এসব ঘটনা ঘটেছে বলে জানান নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম।
জেলার শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাধারণ মানুষ, উভয় দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, পুলিশ কর্মকর্তা ও বিজয়ী প্রার্থীরা।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রামের ধানাইদহ এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষ, বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এ সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নগর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির হাসিনুর রহমানসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন এবং আটটি বাড়িঘরের ভাঙচুর চালানো হয়।
সংঘর্ষের সময় কয়েকটি গুলি ছোঁড়া হয়েছে বলেও জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ঘটনার পরে আহত হাসিনুর রহমানসহ দুজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অন্যদের ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
ভাঙচুর করা বাড়িঘর পরিদর্শন করে বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে জানিয়ে নাটোরের পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুল ওয়াহাব বলেন, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে আটক করা হয়েছে।
এ ঘটনার সাথে সাথে নাটোরের প্রায় সব উপজেলা থেকেই রাজনৈতিক বিরোধের জেরে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার খবর আসতে থাকে।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে নাটোরের সিংড়ার পৌরসদরের পারসিংড়া এলাকায় ধানের শীষে ভোট করায় এছাতন নামে এক নারীকর্মীর হাতের আঙ্গুল ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
সেই নারীকে উদ্ধারে বিএনপির সমর্থকেরা এলে তাদের আটজনের ওপরে হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানান সিংড়া থানার ওসি আসম আব্দুন নূর।
Manual7 Ad Code
এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত নিয়ামুল ইসলাম নেহাল নামে একজনকে আটক করা হয়েছে, বাকিদেরও আটকের চেষ্টা চলছে বলে জানান ওসি।
একই সময়ে সিংড়ার কালিগঞ্জ বাজারে একটি চায়ের দোকানে চা পানের সময় ছাতারদীঘি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলতাব হোসেনকে মারধর করেন একই ইউপির যুবদল নেতা শামিম হোসেন।
Manual3 Ad Code
পরে স্থানীয় লোকজন সাবেক চেয়ারম্যানকে উদ্ধার করে সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন বলে স্থানীয়দের বরাতে জানান সিংড়া থানার ওসি আসম আব্দন নূর।
আহত আলতাব হোসেন বলেন, “আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে আমার পুকুরের মাছ বিক্রির লক্ষাধিক টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে শামিম হোসেন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দাউদার মাহমুদের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছিলাম তাই আমাকে মারধর করা হলো, আমি মামলা করব।”
তবে, ‘বেশি কিছু না, শুধু দুটো চড় মারার’ কথা বলে পাল্টা অভিযোগ করেছেন শামিম হোসেন।
স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, “২০১৭ সালে ইউপি নির্বাচনে আমি ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছিলাম কিন্তু আলতাব হোসেন তখন আওয়ামী লীগে ছিলেন। আমাকে মারধর করেছিলেন উনি। ওই ক্ষোভ থেকেই তাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য দুটো চড় মেরেছি, বেশি কিছু না।”
এদিকে, শনিবার দুপুরে নাটোরের গুরুদাসপুরের বিন্যাবাড়ি বাজার ও দক্ষিণ নারীবাড়ি এলাকায় পৃথক হামলার ঘটনায় রাজেদুল ইসলামসহ তিন জামায়াত কর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে।
দুটি ঘটনাতেই বিএনপি সমর্থকেরা দল বেঁধে তাদের উপর হামলা করে বলে অভিযোগ জামায়াত কর্মীদের।
বিন্যাবাড়ি বাজারের হামলাকারীরা মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করে বলে জানায়, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
Manual8 Ad Code
এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন এবং তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান গুরুদাসপুর থানার ওসি শফিকুজ্জামান সরকার।
গুরুদাসপুর উপজেলা জামায়াতের আমির আব্দুল আলিম বলেন, “নির্বাচন পরবর্তী এমন ঘটনা দুঃখজনক। এসব হামলা বন্ধ করতে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ ও তার নেতাকর্মীদের আমি অনুরোধ জানাই।”
Manual8 Ad Code
নির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়ে, কেউ নির্দেশনা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
এছাড়া, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে নাটোরের নলডাঙ্গার শ্যামনগর এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মৎস্যচাষী ও জামায়াত কর্মী হামিদুল ইসলামকে মারধর করার অভিযোগ উঠে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল এবং অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান নলডাঙ্গা থানার ওসি, নূরে আলম।
দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তারা শামসুলের দুই ছেলে মানিক আলী প্রামাণিক ও রতন আলী প্রামাণিককে কুপিয়ে আহত করে এবং বাড়ির দুটি ছাগল ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
নির্বাচনে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপুর ভোট করায় বিএনপি সমর্থক শাহাদত হোসেন ও তার লোকজন এ হামলা চালায় বলে অভিযোগ আহতদের। যদিও, এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন শাহাদত হোসেন।
এর বাইরে রাত ৯টার দিকে লালপুরের ওয়ালিয়া বাজারে নির্বাচন পরবর্তী বিরোধের জেরে বিএনপি প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় উভয়পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
এ ঘটনায় ওয়ালিয়া বাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুইজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানান লালপুর থানার ওসি মজিবুর রহমান।
স্থানীদের বরাতে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম বলেন, ওয়ালিয়া বাজারে নির্বাচনি বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপুর সমর্থকেরা বিএনপি প্রার্থী ফারজানা শারমিন পুতুলের দুই কর্মীকে মারধর করেন।
পরে খবর পেয়ে বিএনপির সমর্থকেরা ঘটনাস্থলে গেলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আটজন আহত হন এবং দুজনকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের ও অবরুদ্ধদের উদ্ধার করে লালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
এ দিকে লালপুরে ও বড়াইগ্রামের সহিংসতার ঘটনা সংবাদ সম্মেলন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন নাটোর ১ ও ৪ আসনের পরাজিত প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপু ও মাওলানা আব্দুল হাকীম।
দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে, নিজেদের নেতাকর্মী, সমর্থক ও অনুসারীদের শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখার কঠিন নির্দেশনা দিয়ে সেই তা অমান্য করলে ব্যবস্থার নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নাটোরের চারটি আসনের বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি সব পক্ষের সকলকে সহনশীল হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন নাটোর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম।