৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকটে বন্ধ; ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে খুলনা
৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকটে বন্ধ; ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে খুলনা
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০৪:৩৩ অপরাহ্ণ
Manual2 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
Manual3 Ad Code
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের জ্বালানি সংকটে বড় ধাক্কা লেগেছে খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায়। বর্তমানে এই অঞ্চলের ১০ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টিই বন্ধ রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনজীবন ও শিল্পোৎপাদনে। খুলনা অঞ্চলের শহর ও গ্রামে শুরু হয়েছে তীব্র লোডশেডিং।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে দশটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট।
তবে জ্বালানি সংকটের কারণে খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট, ফরিদপুর ৫০ মেগাওয়াট, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির খুলনা ২২৫ মেগাওয়াট, মধুমতি ১০০ মেগাওয়াট এবং রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রসহ মোট ৬টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর মাহফুজুর রহমান বলেন, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার (এনএলডিসি) থেকে বিদ্যুতের চাহিদা পাচ্ছি না। আমাদের হাতে কোনো জ্বালানি নেই। জ্বালানি পেলে কেন্দ্রটি চালাতে প্রস্তুত আছি। অন্যদিকে, বিদেশি ঋণ সহায়তায় নির্মিত কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে গেলেও তা পুরো অঞ্চলের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
গ্রীষ্ম মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো অপচয় রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুজ্জামান বলেন, সীমিত সরবরাহের মধ্যে চাহিদা সামাল দিতে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে বিদ্যুতের অপচয় কমাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করছি। সেখানে আমরা তাদের বিদ্যুতের অপচয় রোধ করতে অনুরোধ করা হয়েছে। সেই অনুরোধেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকান, শপিংমল সন্ধ্যা ৭টার পর বন্ধ রাখতে বলেছি।
এদিকে, চলমান সংকটকে বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে।
এক সংবাদ সম্মেলনে ‘প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম (ফেড)’ জানায়, দেশের এলএনজি আমদানির ৬৮-৭৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এই রুটে সরবরাহ ব্যাহত হলে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়ে।
সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট। গ্যাস ও তেলের ঘাটতিতে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ, যা শ্রমবাজারেও চাপ তৈরি করছে।
ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফার্নেস অয়েলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ১৮ টাকার বেশি হলেও সৌরবিদ্যুতে তা প্রায় অর্ধেক, প্রায় ৯ টাকা। এ বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।
Manual1 Ad Code
প্রতিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তর না ঘটালে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে।
তাদের মতে, দেশের ৪ কোটির বেশি পরিবারের ছাদের একটি বড় অংশ ব্যবহার করে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। পাশাপাশি কৃষিখাতে সৌর সেচ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—সৌর সরঞ্জামে শুল্ক-ভ্যাট প্রত্যাহার, বাড়িভিত্তিক সৌর প্যানেলে ভর্তুকি, দ্রুত সৌর পার্ক অনুমোদন এবং বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকেন্দ্রীকরণ।
সিনিয়র সাংবাদিক এবং প্রতিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, সময়মতো নীতিগত পরিবর্তন না আনলে জ্বালানি নির্ভরতা আরও বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, সারা পৃথিবীতে যেখানে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তির উপর নির্ভরতা বাড়ানো। তাই তেলের জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তি নিয়ে পরিকল্পনা সাজানোর দাবি জানান তিনি।