আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হিমাগারের অভাবে মৌলভীবাজারের কৃষকেরা বিপাকে

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ
হিমাগারের অভাবে মৌলভীবাজারের কৃষকেরা বিপাকে

Manual2 Ad Code

তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:

কৃষকদের উৎপাদিত নানান ধরনের ফলমূল ও মৌসুমি সব্জির জন্য মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার পরিচিতি দেশ থেকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। এ দুই উপজেলায় হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) না থাকায় প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার মৌসুমি ফল ও সব্জি।

এ দুটি উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় কৃষকেরা অতিকষ্টে বিভিন্ন তরিতরকারি ও ফলমূল উৎপাদন করছেন। কিন্তু মজুত করে রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে সল্প মূল্যে এসব কৃষি পণ্য বিক্রি করতে হয়। এতে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

Manual4 Ad Code

কৃষকদের ভাষ্যমতে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় হিমাগার স্থাপন করা হলে তাদের উৎপাদিত মৌসুমি সব্জি ও ফল সেখানে রাখতে পারবেন। এতে তারা এসব পণ্যের ন্যায্য মূল্যে যেমন পাবেন, তেমনি বিপুল পরিমাণ সব্জি ও ফল নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা ও করতে পারবেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কৃষিনির্ভর কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল অন্যতম উপজেলাগুলোতে প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ আলু, টমেটো, করলা, সিম,শসা, আনার, লেবুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল-ফসল উৎপাদিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন এ দুই উপজেলায় হিমাগার স্থাপিত না হওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় স্থানীয় কৃষকরা। বারবার আশ্বাস আর ফাইলবন্দী প্রস্তানার মাঝেই আটকে আছে কৃষকদের এই প্রাণের দাবি। ফলে পচে নষ্ট হচ্ছে কষ্টার্জিত ফসল।

Manual1 Ad Code

কমলঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রের বরাতে জানা যায়, উপজেলার আদমপুর, মাধবপুর, আলীনগর, ইসলামপুর, মুন্সীবাজার, পতনঊষার, কমলগঞ্জ সদর, রহিমপুর ইউনিয়নসহ পৌরসভায় বিপুল পরিমাণ সবজি চাষ হয়। তবে হিমাগার না থাকায় ফসল তোলার মৌসুমে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। বাধ্য হয়ে কম দামে সবজি বিক্রি করতে হয়, নতুবা সংরক্ষণের অভাবে মাঠেই পচে যায় টন টন ফসল। কৃষকদের অভিযোগ, সংরক্ষণের সুবিধা থাকলে তারা অফ-সিজনে ভালো দামে পণ্য বিক্রি করতে পারতেন।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, বিগত দিনের বিভিন্ন সময়ে সরকারি পর্যায়ে হিমাগার নির্মাণের জন্য জায়গা নির্বাচন ও প্রাথমিক প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে সেই প্রস্তাবনার ফাইল আর আলোর মুখ দেখেনি। কৃষকদের দাবির মুখে মাঝে মধ্যে আশার বাণী শোনলেও বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

Manual2 Ad Code

টমোটো চাষি আব্দুল মতিন জানায়, আমরা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলাই, কিন্তু রাখার জায়গা নেই বলে পানির দরে বিক্রি করতে হয়। একটা কোল্ড স্টোরেজ হলে আমাদের আর ঋণের জালে জড়াতে হতো না। ফসল মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে যায়। হিমাগারে রাখতে পারলে পরে লাভজনক দামে বিক্রি সম্ভব।’

স্থানীয় আলু চাষিদের বীজের জন্য বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। হিমাগার থাকলে তারা নিজেদের বীজ নিজেই সংরক্ষণ করতে পারতেন। হিমাগার থাকলে কৃষকরা বড় পরিসরে চাষাবাদে আগ্রহী হবেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে।

স্থানীয় কৃষকরা জানায়, ‘চায়ের রাজ্যখ্যাত একটি পাতা দুটি কুঁড়ির শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চা এবং লেবুর পরেই রয়েছে আনারসের বিশাল চাষ। জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সারা বছরই কমবেশি আনারস পৌঁছে যায়। কিন্তু সবজি ও আনারস- লেবু সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পঁচে নষ্ট হয়। অধিকাংশ সময় পঁচনশীল কৃষি পণ্য পচে যাওয়ার শঙ্কায় কৃষকদের নাম মাত্র মূল্যে অনেক সময় এসব পণ্য বিক্রি করে দিতে হয়। তাই আনারস সংরক্ষণের জন্য একটি হিমাগারের খুব জরুরি।’

জানতে চাইলে কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, ‘কমলগঞ্জ উপজেলায় টমেটোসহ বিভিন্ন শাক-সবজি উৎপাদন হয়। এসব কৃষিপণ্য পচনশীল হওয়ার হিমাগার অতীব জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারিভাবে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে-এটি এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

Manual2 Ad Code

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানায়, ‘হিমাগার স্থাপনের বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবগত করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

একই চিত্র জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলারও। এখানেও হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) না থাকায় সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকেরা।

স্থানীয় কৃষকেরা জানায়, ‘হিমাগার না থাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য মধ্যস্বত্বভোগী লোকজনের কাছে বাধ্য হয়েই সল্প মূল্য বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে করে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।’

শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘অনেক কৃষক আমাদের কাছে অভিযোগ করেন যে, সব্জিসহ আনারস পঁচে নষ্ট হয়ে ক্ষতিগ্রস্তর মুখে পড়েছে তারা। এসব কৃষি পণ্য সংরক্ষণের জন্য শ্রীমঙ্গলে একটি হিমাগার স্থাপনের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। কৃষকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে শ্রীমঙ্গলে একটি হিমাগার স্থাপনের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ের নিকট চিঠি পাঠিয়েছি।’