আজ শনিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলে আঘাত হানছে ইরানের গুচ্ছ বোমা

editor
প্রকাশিত মার্চ ১১, ২০২৬, ০২:৩৫ পূর্বাহ্ণ
ইসরায়েলে আঘাত হানছে ইরানের গুচ্ছ বোমা

Manual2 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে ইরানের ক্লাস্টার (গুচ্ছ) বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আহত আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার সকালের ওই হামলায় আহত হওয়ার পর মঙ্গলবার তিনি মারা যান। এ নিয়ে এই হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল দুইজনে।

চলমান যুদ্ধে ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে এমন অনেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যেগুলোর ওয়ারহেডে (বিস্ফোরক মুখে) গুচ্ছ বোমা রাখা হয়েছে। এই সব বোমা নির্বিচার ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

Manual7 Ad Code

ক্লাস্টার ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড থেকে বের হওয়া ছোট ছোট বোমা (সাবমিউনিশন) ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলের অন্তত ছয়টি স্থানে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ইয়েহুদ, অর ইয়েহুদা, হোলোন ও বাত ইয়াম শহরও রয়েছে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন রুস্তম গুলমোভ ও আমিদ মুর্তুজোভ। তাঁদের দুজনেরই বয়স ৪০-এর কোঠায় এবং তাঁরা পেতাহ তিকভা শহরের বাসিন্দা।

Manual6 Ad Code

ওই দুই ব্যক্তি ইয়েহুদ শহরের একটি অবকাঠামো নির্মাণস্থলে কাজ করছিলেন। এ সময় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া গুচ্ছ বোমার একটি ওই এলাকায় আঘাত হানে।

উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, হামলার সময় তাঁরা কোনো বোমা আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ স্থানে ছিলেন না।

চিকিৎসকেরা ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। অপরজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হলো।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হোম ফ্রন্ট কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল শাই ক্লাপার জানিয়েছেন, ওই নির্মাণস্থলের কয়েক ডজন শ্রমিক বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে ঢুকে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

Manual7 Ad Code


ইসরায়েলের পেতাহ তিকভায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ঘটনাস্থলে কাজ করছেন একজন উদ্ধারকর্মী। ৩ মার্চ ২০২৬ছবি: রয়টার্স

সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘এই নির্মাণস্থলে আমরা একটি কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি, যেখানে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে আমি বলতে চাই যে এখানে কয়েক ডজন শ্রমিকের জীবন রক্ষা পেয়েছে। তাঁরা সুরক্ষিত জায়গায় ছিলেন এবং নির্দেশনা মেনে চলেছিলেন বলেই তাঁদের জীবন বেঁচে গেছে।’

হামলার সময় অর ইয়েহুদা শহরে আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, গুচ্ছ বোমার আঘাতে আহত হওয়ার সময় তিনিও কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন না।

হামলার সময় ইয়েহুদ শহরের নির্মাণস্থলে উপস্থিত থাকা একজন ক্রেনচালক হারেৎজ পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় নির্মাণশ্রমিকেরা কতটা বিপদের সম্মুখীন হন, সে বিষয়টিই তুলে ধরেছেন তিনি।


ইসরায়েলের পেতাহ তিকভায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ঘটনাস্থলে কাজ করছেন ইসরায়েলি সেনারা। ৩ মার্চ ২০২৬ছবি: রয়টার্স

সংবাদমাধ্যমটিকে তিনি বলেন, ‘আমি নিচে নেমে আসি এবং কোনোমতে প্রাণে বাঁচি। সতর্কতা সংকেত পাওয়ার পর আমি ক্রেনের লোড বিচ্ছিন্ন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এরপর ক্রেন বন্ধ করে নিচে নামি। এতে কয়েক মিনিট সময় লেগেছিল, সময় ফুরিয়ে আসছিল। যখন আমি নিচে নামা শুরু করি, তখন সাইরেন বাজতে শুরু করে।’

নিচে নামার পর তিনি দুই ব্যক্তিকে দেখেছিলেন, যাঁরা পরে মারা গেছেন। এরপরই তিনি আত্মরক্ষার্থে দ্রুত কাছের একটি ভূগর্ভস্থ পার্কিং গ্যারেজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্যারেজে নামার ঠিক ১০ সেকেন্ড পরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। আধা মিনিট পর ওপরে উঠে দেখি তারা দুজনেই মেঝেতে পড়ে আছে। তারা কেন ভেতরে যায়নি, তা আমি বুঝতে পারলাম না।’

ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলের অপর একটি এলাকায় গুচ্ছ বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ি পরিদর্শনে যান শাই ক্লাপার। সেখান থেকে তিনি ইসরায়েলিদের জরুরি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এই নির্দেশনাগুলোই ‘জীবন বাঁচায়’।

তিনি বলেন, ‘এই অ্যাপার্টমেন্টে গুচ্ছ বোমা আঘাত হেনেছে। আমি জানি হামলার মাত্রা হয়তো কিছুটা কম, আর সাইরেন বাজার সংখ্যা হয়তো একটু বেশি। কিন্তু এই অ্যাপার্টমেন্টটির অবস্থা প্রমাণ করে যে গুচ্ছ বোমাও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম।’

ক্লাপার জানান, অ্যাপার্টমেন্টের কোনো সদস্যের ক্ষতি হয়নি। কারণ ওই পরিবারটি হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা মেনে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিল।

ক্লাস্টার মিসাইল কী?

ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) তথ্যমতে, এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের (ক্লাস্টার মিসাইল) ওয়ারহেড নিচের দিকে নামার সময় খুলে যায়। এ সময় প্রায় ৮ কিলোমিটার (৫ মাইল) এলাকাজুড়ে ২৪ থেকে ৮০টি ছোট ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়, যার প্রতিটিতে প্রায় আড়াই কেজি বিস্ফোরক থাকে।

এই ছোট বোমাগুলোর নিজস্ব কোনো চালিকা শক্তি বা দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা থাকে না। এগুলো স্রেফ নিচে আছড়ে পড়ে এবং কোনো কিছুতে আঘাত লাগার সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরিত হয়।

ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বড় এলাকাজুড়ে হুমকি তৈরি করে। তবে প্রতিটি গুচ্ছ বোমার বিস্ফোরণ তুলনামূলক অনেক কম হয়।

অন্যদিকে ইরানের সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডে প্রায় ৫০০ কেজি বিস্ফোরক ঠাসা থাকে, যা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম।

আইডিএফ নিশ্চিত করেছে যে চলমান যুদ্ধ ছাড়াও ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধেও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকবার গুচ্ছ বোমাবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। এ ছাড়া গত বছর ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরাও ইসরায়েলে বেশ কয়েকটি গুচ্ছ বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

ইসরায়েলের চিকিৎসা কর্মীরা জানান, ৩ মার্চ গুচ্ছ বোমার ওয়ারহেড থেকে ছড়ানো ছোট ছোট বোমা মধ্য ইসরায়েলের কয়েকটি স্থানে আঘাত হানে। এতে ১২ জন আহত হন। এই ছোট বোমাগুলো একটি ছোট রকেটের সমান ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে।
১ মার্চের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গুচ্ছ বোমার ওয়ারহেড খুলে যাওয়ার পর দুই ডজনের বেশি টুকরা আকাশ দিয়ে ধেয়ে আসছে এবং মধ্য ইসরায়েলজুড়ে বোমা ছড়িয়ে পড়ছে।

Manual4 Ad Code

মাটিতে পড়ার পর এসব ছোট বোমার কয়েকটি বিস্ফোরিত হয় না। ফলে পরবর্তী সময় যে কেউ এগুলোর সংস্পর্শে এলে মারাত্মক বিপদে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

তথ্যসূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল