আজ রবিবার, ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার; ভারতীয় উদ্যোগের মতো বিশ্বের কোথাও সীমান্তে কুমির-বিষধর সাপ ছাড়ার নজির কি আছে

editor
প্রকাশিত মে ১, ২০২৬, ০৩:৪৫ অপরাহ্ণ
আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার; ভারতীয় উদ্যোগের মতো বিশ্বের কোথাও সীমান্তে কুমির-বিষধর সাপ ছাড়ার নজির কি আছে

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী যেসব নদী এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া কঠিন, সেখানে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে কুমির ও বিষধর সাপের মতো শিকারি প্রাণী ছাড়ার একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ভারত। মূলত এসব দুর্গম এলাকায় অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ‘প্রাকৃতিক বাধা’ তৈরি করতেই এমন প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত অত্যন্ত দুর্গম ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে গেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার খতিয়ে দেখেছে, এই সীমান্তের কিছু অংশে কোনোভাবেই কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়।

গত ২৬ মার্চ এক অভ্যন্তরীণ চিঠিতে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ফ্রন্টের সদর দপ্তরগুলোকে একটি নির্দেশ দিয়েছে। এতে সীমান্তের ‘ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথগুলোতে সরীসৃপ ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাব্যতা’ যাচাই করে দেখতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেওয়ার ভারতের এমন পদক্ষেপ দেশটির মানবাধিকারকর্মী এবং বন্য প্রাণী সংরক্ষণকারী উভয় পক্ষকেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্তের উভয় পাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং এই অঞ্চলের বাস্তুসংস্থানের জন্য এমন পদক্ষেপের ঝুঁকি ঠিক কতটা? কেন ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী হিংস্র বন্য প্রাণী মোতায়েন করতে চায়?

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্যের কাছ দিয়ে গেছে। এই এলাকাগুলো পাহাড়, নদী ও উপত্যকা ঘেরা অত্যন্ত দুর্গম এক ভূখণ্ড।

  • সাম্প্রতিক এক চিঠিতে বিএসএফ তাদের ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা নদীপথের ফাঁকা জায়গাগুলোয় সরীসৃপ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে তাঁরা এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিলেন, তা যেন দ্রুত জানান। ‘নর্থইস্ট নিউজ’ নামের একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

নয়াদিল্লি ইতিমধ্যে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া দিয়েছে। কিন্তু বাকি অংশগুলোয় জলাভূমি ও নদী রয়েছে। এসব জায়গায় সীমান্তের উভয় পাশে স্থানীয় মানুষ বসবাস করেন।

Manual3 Ad Code

সাম্প্রতিক এক চিঠিতে বিএসএফ তাদের ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা নদীপথের ফাঁকা জায়গাগুলোয় সরীসৃপ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিলেন, তা যেন দ্রুত জানাতে হবে। ‘নর্থইস্ট নিউজ’ নামের একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গত বছরের প্রতিবেদনে বিএসএফের কার্যক্রমের প্রশংসা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়া সত্ত্বেও বিএসএফ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। সংস্থাটি বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অপরাধ দমনে সক্রিয় রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নদী বা নিচু এলাকা, সীমান্তের খুব কাছের বসতি, জমি অধিগ্রহণ–সংক্রান্ত ঝুলে থাকা মামলা এবং সীমান্তবাসীর প্রতিবাদের কারণে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় বেড়া দেওয়ার কাজ ধীরগতিতে চলছে।

২০২৪ সালের ১৬ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে হুগলি নদীর জলসীমায় মূল ভূখণ্ড থেকে ঘোড়ামারা দ্বীপে ফেরিতে যাতায়াত করছেন সাধারণ মানুষছবি: রয়টার্স।

এই ভাবনার নেপথ্যে কী

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, অনথিভুক্ত অভিবাসীরা ভারতের জন্য হুমকি। তাঁরা মনে করেন, এতে ভারতের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে যাচ্ছে।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদি সরকার এই যুক্তি ব্যবহার করে দেশটির ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাঙালি মুসলিমদের হয়রানি করছে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলা অঞ্চলকে দ্বিখণ্ডিত করলেও সীমান্তের দুই পাশের মানুষের সাংস্কৃতিক ও জাতিগত শিকড় এখনো একই রয়ে গেছে।

বন্দুকের মুখে ভারতীয় মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে বিএসএফ কর্মকর্তারা এর আগে বেশ কয়েকবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন।

ভারতে অনথিভুক্ত অভিবাসীর সংখ্যা কত, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এ মাসেই নতুন আদমশুমারি শুরু হয়েছে, এর আগেরটি হয়েছিল ২০১১ সালে।

মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মান্দার বলেন, অনথিভুক্ত অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেও ভারতের উচিত ছিল বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা বা বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। তা না করে ভারত তাঁদের মোকাবিলায় ‘বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি’ বেছে নিয়েছে।

২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছে ভারতের পেট্রাপোলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর দৃশ্যছবি: রয়টার্স।

এ ছাড়া মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, মুসলিমদের ‘অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করার অজুহাত হিসেবে এই বিষয়কে ব্যবহার করছে ভারত।

আল-জাজিরাকে হর্ষ মান্দার বলেন, ‘ভারতের তথাকথিত “বিতর্কিত নাগরিকত্ব” বিষয়টি নিষ্ঠুর এবং এটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক রীতির লঙ্ঘন।’ অভিবাসীদের আটক করার অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তবে ভারতীয় মুসলিমদের সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিয়ে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মান্দার আরও যোগ করেন, ‘এটি বাঙালি মুসলিমদের সার্বক্ষণিক এক আতঙ্কের মধ্যে রাখার কৌশল। এর মাধ্যমে তাঁদের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেকোনো সময় তাঁদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া হতে পারে।’

অংশুমান চৌধুরী উদাহরণ দিয়ে বলেন, আসামে ভারত ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ নামের আধা-বিচার বিভাগীয় আদালত গঠন করেছে। ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের অধীনে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ভারতীয় নাকি বিদেশি—তা নির্ধারণ করেন এই আদালত।

চৌধুরী বলেন, তিনি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে এমন অনেক মামলায় কাজ করেছেন যেখানে শুধু প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখাতে না পারার কারণে ভারতীয়দের ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে।

চৌধুরী বলেন, ‘এই জোরপূর্বক বহিষ্কারের প্রক্রিয়াগুলো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের নতুন এক কৌশল, যা খুবই বিপজ্জনক।’

অংশুমান চৌধুরী মনে করেন, সীমান্ত এলাকায় কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ার পরিকল্পনাটি মূলত ভারতীয় মুসলিমদের প্রতি সরকারের একই বিদ্বেষী নীতির প্রতিফলন।

২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি আগরতলার উপকণ্ঠে রাইমুরা গ্রামে বাংলাদেশ থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পার হওয়ার সময় আটক মুসলিম প্রধান রোহিঙ্গাদের নাম নিবন্ধন করছেন বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) এক কর্মকর্তাছবি: রয়টার্স।

বাস্তুসংস্থানে কী প্রভাব পড়বে

ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার কৌশল ও লিয়াজোঁ প্রধান রথীন বর্মন আল-জাজিরাকে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদীগুলোয় সাধারণত কুমির থাকে না।

Manual1 Ad Code

বর্মন জানান, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এবং আসামের নির্দিষ্ট কিছু জলাভূমিতে কুমির পাওয়া যায়, যা সীমান্ত এলাকা থেকে অনেক দূরে। যদি তাঁদের জোর করে সীমান্তে আনা হয়, তবে তাঁরা হয়তো বেঁচে থাকতে পারবে না।

রথীন বর্মন বলেন, ‘তারা খুব দ্রুতই মারা যাবে। তথাকথিত বিষধর সাপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।’

বন্য প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণ ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন রথীন বর্মন।

রথীন বর্মন বলেন, ‘আমরা যদি জোর করে এটি করি, তবে তা পুরো খাদ্যশৃঙ্খল বা বাস্তুসংস্থানে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। আমি সেই সব প্রাণীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন, যাদের এই পৃথিবী এবং ওই এলাকায় বেঁচে থাকার সমান অধিকার আছে।’

  • মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদি সরকার এই যুক্তি ব্যবহার করে দেশটির ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাঙালি মুসলিমদের হয়রানি করছে।

রথীন বর্মন আরও বলেন, ‘প্রযুক্তিগতভাবে এটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। খোলা ও প্রবাহিত নদীতে এই কৌশল কখনোই কাজে আসবে না।’

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জলাভূমিগুলো বন্যাকবলিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর ফলে বিষধর সাপগুলো লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে মাছ ধরাসহ অন্যান্য কাজের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় মানুষের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মান্দার বলেন, ‘এই ধরনের নীতি ভারতীয় রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতারই প্রতিফলন। নদীতে কোনো মানুষকে কুমির, সাপ কিংবা বন্দুকের মুখে ঠেলে দেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।’

মান্দার আরও বলেন, ‘ভারত রাষ্ট্র যা করতে পারছে না, এই প্রাণীরাও তা পারবে না। অর্থাৎ তারা চিহ্নিত করতে পারবে না, কে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। তারা অবশ্যই সীমান্তের উভয় পাশের সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালাবে।’

২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের সুন্দরবনের সাতজেলিয়া দ্বীপের কাছে একটি নদীর তীরে এক নারী মাছ ধরছেনছবি: রয়টার্স।

বিশ্বের আর কোথাও কি এমনটা হয়েছে

আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাহারায় হিংস্ত্র শিকারি প্রাণী মোতায়েন করার কোনো আধুনিক নজির নেই।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে অভিবাসীদের আটকাতে সাপ বা কুমিরে ভরা পরিখা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। তবে তিনি পরে এই খবরকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘সীমান্ত সুরক্ষায় আমি কঠোর হতে পারি, তবে এতটাও নই।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রে এর একটি সমান্তরাল উদাহরণ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ফ্লোরিডায় একটি আটক কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ট্রাম্প-সমর্থক কর্মকর্তারা এর নাম দিয়েছেন ‘অ্যালিগেটর অ্যালকাট্রাজ’।

দুর্গম জলাভূমিতে অবস্থিত হওয়ায় এবং সেখানে শিকারি প্রাণীদের আনাগোনা থাকায় এই আটক কেন্দ্র থেকে বন্দীদের পালানো প্রায় অসম্ভব। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই কেন্দ্রটির অমানবিক পরিবেশ এবং পরিবেশের ক্ষতির সমালোচনা করে এটি বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

Manual2 Ad Code

 

Manual6 Ad Code