আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ

editor
প্রকাশিত মার্চ ২২, ২০২৬, ০১:১৬ পূর্বাহ্ণ
বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ

Manual5 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

পাশাপাশি দুটি ভবনেই সুনসান নীরবতা। সিঁড়ি বেয়ে উঠলেও মেলেনি তেমন সাড়াশব্দ। পঞ্চম তলার একটি কক্ষে জানান দেয় ষাটোর্ধ্ব এক মানুষের উপস্থিতি। দরজায় কড়া নেড়ে অনুমতি চাইতেই প্রবেশের ইঙ্গিত দিলেন। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে টেবিলে বিভিন্ন লেখকের বই সারিবদ্ধ সাজানো। আছে দৈনিক পত্রিকাও। কম্পিউটারের ডেস্কটপে ইন্টারনেটে দেখেন দেশ-বিদেশের খবরও। তবু একাকীত্বের কথা মনে পড়লে নীরবে ডুকরে কাঁদেন।

এভাবেই দিনের পর দিন একাকী জীবন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দারা। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনটাও তাদের কেটেছে স্বজন ছাড়া। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের প্রবীণ নিবাসে থাকা কয়েকজন বাসিন্দারসঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের।

অন্য আর দশ দিন নিজেদের মতো করে চললেও ঈদের দিন বিশেষ খাবারের আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সকালে ভুনা খিচুড়ির সঙ্গে ডিম ও মিষ্টান্ন এবং দুপুরে পোলাও, মুরগির রোস্ট ও খাসির মাংস দেওয়া হয়। রাতে ভাত, মুরগি ও ডাল।

বেশ কয়েক বছর ধরেই একাকী জীবনযাপন করছেন সলিমুল্লাহ খন্দকার। বেসরকারি চাকরি থেকে ২০১৮ সালে অবসর নেওয়ার পর অনেকটা বেকার সময়ই কাটছে তার। প্রবীণ নিবাসে উঠেছেন এক বছর তিন মাস আগে। তার দুই ছেলেই ভালো কোম্পানিতে চাকরি করেন। মাঝেসাঝে বাবাকে দেখতে এলেও সঙ্গে নেওয়ার কথা বলেন না। ৬৮ বছর বয়সে সব থাকতেও কিছুই নেই তার।

Manual4 Ad Code

Manual4 Ad Code

  • এখানে একেকজনের একেক রকম গল্প থাকতে পারে। কিন্তু আমি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ভুল করেছিলাম, যার মাশুল দিতে হচ্ছে এখন। সবচেয়ে বড় কথা আমাকে একা থাকতে হচ্ছে। এটাই আমার জীবনের বাস্তবতা
  • প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দা সলিমুল্লাহ খন্দকার

ঈদের দিন সারাক্ষণ নিজ কক্ষেই সময় কাটান সলিমুল্লাহ। সন্ধ্যায় হালকা নাশতা সেরে পত্রিকা পড়ার পর কম্পিউটারের ডেস্কটপে ইউটিউবে খবর দেখছিলেন। সময় কাটাতে কখনও গল্প-কবিতার বই, পত্রপত্রিকা বা ইউটিউবে খবর দেখেন তিনি।

জীবনের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই শেষ বয়সে প্রবীণ নিবাসে থাকতে হচ্ছে বলে জানান সলিমুল্লাহ। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখানে একেকজনের একেক রকম গল্প থাকতে পারে। কিন্তু আমি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ভুল করেছিলাম, যার মাশুল দিতে হচ্ছে এখন। সবচেয়ে বড় কথা আমাকে একা থাকতে হচ্ছে। এটাই আমার জীবনের বাস্তবতা।

  • আমি চাই কখনও কাউকে যেন বৃদ্ধাশ্রমে না থাকতে হয়। এখানে আসার মানে যেন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা। এছাড়া আর কোনো কাজ নেই। কেননা পরিবারের সঙ্গে থাকলে হয়তো আরও কিছুদিন বেশি বাঁচতাম। এখানে থাকলে মৃত্যুটা খুব কাছাকাছি। তবে সুস্থতার সঙ্গে মরে যেতে পারলেই হয়, আর কোনো ইচ্ছে নেই
    প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দা

একাকিত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে সলিমুল্লাহ বলেন, আগে ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকতাম। সে সময়টা আরও বেশি নিঃসঙ্গ ছিল। সেখানে মারা গেলে দুই-তিন দিনেও কেউ জানত না। এখানে অন্তত ওই ভয়টা নেই। এছাড়া এখানে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয় না; অর্থাৎ নিজের খরচে চলছি। তবে সংসার জীবনের চেয়ে ভালো আর আনন্দের জীবন হয় না। এখানে ওই নিঃসঙ্গতা সবসময় আছে। দিনশেষে আমি একা।

ঈদ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে মিশে যায় স্মৃতি আর বাস্তবতার তীব্র পার্থক্য। তিনি বলেন, আগে নিজের বাসায় থাকতাম। একা হলেও মনে হতো পরিবারের কাছেই আছি। এখন তো সবসময় মনে হয় আমি বৃদ্ধাশ্রমে আছি। সন্তানদের কাছে থাকলে সবসময় একটা ব্যস্ততার মাঝে থাকতে পারতাম। সেই ব্যস্ততাটা এখন নেই। বেকার সময় কাটাতে বই, পত্রিকা পড়ি নয়তো কম্পিউটার চালাই। এরপরও সেই ব্যস্ততাটা মানতে পারছি না। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত আমি একাই থাকলাম।

জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ঈদের স্মৃতি খুঁজে পান শৈশবে গ্রামের বাড়িতে। মা-বাবার সঙ্গে খুব দারিদ্র্যের মধ্যে ঈদ করতেন। নতুন কাপড় না থাকলেও গুড় দিয়ে রান্না করা সেমাই খাওয়ার আনন্দটা ছিল তার কাছে অন্যরকম। এখন ভালো খাবার ও জামাকাপড় থাকলেও সেই আনন্দ আর নেই। কখনও যদি আগের সময়ে ফিরে যাওয়া যেত, তাহলে নতুন করে জীবনটাকে পুনরায় সাজাতেন বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন এই বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটি।

Manual7 Ad Code

শেষ কথায় যেন জমাট বাঁধা এক নিঃশব্দ হাহাকার শোনা যায় সলিমুল্লাহর কণ্ঠে। তিনি বলেন, আমি চাই কখনও কাউকে যেন বৃদ্ধাশ্রমে না থাকতে হয়। এখানে আসার মানে যেন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা। এছাড়া আর কোনো কাজ নেই। কেননা পরিবারের সঙ্গে থাকলে হয়তো আরও কিছুদিন বেশি বাঁচতাম। এখানে থাকলে মৃত্যুটা খুব কাছাকাছি। তবে সুস্থতার সঙ্গে মরে যেতে পারলেই হয়, আর কোনো ইচ্ছে নেই।

Manual1 Ad Code

সত্তর বছরের বেশি বয়সী এক নারী ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রবীণ নিবাসে থাকছেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তার দুই ছেলেরই যুক্তরাজ্যে বসবাস। মাকে দেখভালের জন্য এখানে প্রতি মাসেই খরচ পাঠান তারা। একাকী থাকা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তার। নাম জানতে চাইলে প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।

একই সময় ধরে প্রবীণ নিবাসে থেকে নিজের সরকারি চাকরি সামলেছেন এক নারী আইনজীবী। অবসরের পর এখন আদালত অঙ্গনে সময় দিচ্ছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি তিনি। ছেলে-মেয়ে না থাকায় আত্মীয়স্বজনের বাসায় না উঠে প্রবীণ নিবাসকেই নিজের আপন ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ষাটোর্ধ্ব এই নারী। তিনিও নাম-পরিচয় প্রকাশে আপত্তি জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নারী আইনজীবী বলেন, এখানকার সবারই টাকা-পয়সা আছে। সচ্ছল পরিবারের লোকজনরাই এখানে আসেন। কারণ এই নিবাসে থাকতে বহু অর্থের প্রয়োজন হয়। শুধুমাত্র পরিবারে অসুবিধার কারণে অনেকেই স্বেচ্ছায় এখানে থাকছেন। তথ্য সুএঃ ঢাকা পোস্ট