আজ বুধবার, ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে এক দশকে বদলে গেল রূপপুর

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৫:৫৪ অপরাহ্ণ
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে এক দশকে বদলে গেল রূপপুর

Manual8 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে গত এক দশকে ঈশ্বরদীর আর্থ-সামাজিক অবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছিল সীমিত, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক সড়কব্যবস্থা, উন্নত আবাসন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক মানের নানা সুযোগ-সুবিধা।

Manual1 Ad Code

প্রকল্পের শুরু থেকেই এখানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের, বিশেষ করে রুশ বিশেষজ্ঞদের বসবাসের জন্য নির্মিত হয়েছে আধুনিক আবাসন এলাকা, যা স্থানীয়ভাবে ‘রাশিয়ান পল্লী’ নামে পরিচিত। এই আবাসনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, শপিংমল ও বিনোদনকেন্দ্র। স্থানীয়দের ভাষায়, ঈশ্বরদী এখন যেন ‘এক টুকরো রাশিয়া’।

এই পরিবর্তন কেবল অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়; স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল সীমিত, সেখানে এখন হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন খাতে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।

শিক্ষায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন রূপপুর প্রকল্প ঘিরে শিক্ষাক্ষেত্রেও সূচিত হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে সচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

রূপপুর প্রকল্পের পারমাণবিক তথ্যকেন্দ্রের উদ্যোগে ঈশ্বরদী উপজেলার ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ কর্মসূচি। এসব আয়োজনে ‘পরমাণু কী’, ‘জ্বালানি কীভাবে তৈরি হয়’ এবং ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব’সহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ বাড়ছে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

Manual8 Ad Code

ঈশ্বরদী মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেন বলেন, রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সূচনা।

তিনি আরও জানান, এখানে ব্যবহৃত VVER-1200 প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ নিতে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলী রাশিয়া গেছেন। এর মাধ্যমে দেশে পারমাণবিক প্রকৌশল শিক্ষার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।

জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা

রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে স্থানীয় জীবনমান ও অর্থনীতিতে। প্রকল্প এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আধুনিক আবাসন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক অবকাঠামো। বিশেষ করে গ্রিনসিটি এলাকা এখন আধুনিক নগরায়ণের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

গ্রিনসিটি ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা হোটেল, রেস্তোরাঁ ও শপিংমল স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন স্থানীয় তরুণ-তরুণীরা। বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অনেকে রুশ ভাষাও শিখে নিয়েছেন, যা তাদের দক্ষতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

গ্রিনসিটির একটি ক্যাফের কর্মী মমিনুল ইসলাম বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে কাজ করতে গিয়ে তিনি রুশ নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের ভাষায় কথোপকথনে দক্ষ হয়ে উঠেছেন। তার ভাষায়, এই প্রকল্প আমাকে শুধু চাকরি দেয়নি, নতুন একটি দক্ষতা অর্জনের সুযোগও করে দিয়েছে।

Manual5 Ad Code

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রোসাটম-এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার রুশ বিশেষজ্ঞ। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক ও কর্মী বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছেন। এই বিপুল কর্মসংস্থান স্থানীয় অর্থনীতিকে করেছে প্রাণবন্ত। ঈশ্বরদী ও আশপাশের অঞ্চল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পরিবহন, আবাসন, খাদ্য সরবরাহ ও খুচরা ব্যবসাসহ প্রায় সব খাতেই বেড়েছে চাহিদা ও বিনিয়োগ।

Manual1 Ad Code

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রকল্পের কারণে তাদের ব্যবসার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় প্রতিযোগিতা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এসেছে ইতিবাচক গতি।

রূপপুরের হাত ধরে বদলে যাওয়া ঈশ্বরদী এখন শুধু একটি জনপদ নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নযাত্রার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

তথ্য সুএঃ ইত্তেফাক